হেলথ ইনফো ডেস্ক :
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ২০২৬-২০২৭ইং অর্থ বছরের স্বাস্থ্যসেবা, মেডিকেল শিক্ষার মানন্নোয়ন, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও চিকিৎসাসেবা খাতসহ প্রস্তাবিত বাজেট বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আজ শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ ডা. মিল্টন হলে এটি অনুষ্ঠিত হয়। এবারের বাজেটে সাধারণ রোগীদের বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামাদি ক্রয়, ক্যান্সার সেবা এবং গবেষণাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতারের সভাপতিত্বে পরিচালক (অর্থ ও হিসাব) খন্দকার শফিকুল হাসান রতন চলতি অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের বিস্তারিত তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বক্তারা বলেন, বিএমইউর ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের সংশোধিত এবং ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের প্রস্তাবিত পরিচালন ও উন্নয়ন বাজেট আজ শনিবার (২৭ জুন) অনুষ্ঠিত ১০০তম সিন্ডিকেট সভায় ২৯তম বাজেট অধিবেশনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৬৩৪ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিএস) থেকে ১৩৬ কোটি ২৮ লক্ষ সাত হাজার টাকা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আয় থেকে ১৬৩ কোটি টাকাসহ সর্বমোট ১০৩৯ কোটি ৫৪ লক্ষ ২৬ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেটে পাশ হয়। এই বাজেটে ১০৫ কোটি ৪৬ লক্ষ ১৯ হাজার টাকা ঘাটতি বাজেট পরিলক্ষিত হয়, যা পরবর্তীতে সংশোধিত বাজেটে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চাহিদার মাধ্যমে সংকলন করা হবে।
এতে আরও বলা হয়, একটি সুস্থ্য ও সমৃদ্ধ জাতি-গঠনে চিকিৎসা সেবা ও গবেষণাকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিয়ে বাস্তব সম্মত, উন্নয়নমুখী ও জনকল্যাণ কেন্দ্রীক এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে স্বাস্থ্য খাতের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ ও আধুনিক চিকিৎসা শিক্ষার পরবর্তী চাহিদাকে সামনে রেখে ‘কস্ট কন্ট্রোল এন্ড কস্ট রিডাকশন’ ব্যয়নীতি অনুসরণের মাধ্যমে এই বাজেট তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বক্তারা বলেন, ‘স্বাস্থ্য সেবা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। সবার জন্য মানসম্মত স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করাই আমাদের মূল অঙ্গীকার। এই কল্যাণমুখী বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে সুস্থ নাগরিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।’
বাজেটের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো-
বিনামূল্যে ওষুধ ও চিকিৎসা সেবায় বিপুল বরাদ্দ
বিনামূল্যে ওষুধ: বহির্বিভাগ ও হাসপাতালে ভর্তিকৃত সাধারণ রোগীদের বিনামূল্যে ঔষধ দেওয়ার বাজেট গত বছরের ১২ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে এবার ২০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। যা চিকিৎসা সেবা প্রাপ্তিতে বড় অবদান রাখবে।
চিকিৎসা সরঞ্জাম (এমএসআর): আধুনিক চিকিৎসার সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবার শৈল্য ও চিকিৎসা সরঞ্জামাদি উপখাতে গত বছরের চেয়ে ৪৭ কোটি ৩৩ লক্ষ টাকা বাড়িয়ে মোট ৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
মেডিসিন ও ইনফেকশন কন্ট্রোল: হাসপাতাল পরিচালনা ও রোগী সেবা নির্বিঘ্ন করতে মেডিসিন এবং ইনফেকশন কন্ট্রোল ডিজিজেস খাতে আরও ১০ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
ক্যান্সার চিকিৎসায় পদক্ষেপ
বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকা একমাত্র ‘লিনিয়ার এক্সেলেটর’ মেশিনটি সচল করাসহ নতুন আরও দুটি অত্যাধুনিক মেশিন ক্রয়ের জন্য ৭৬ কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি দেশের ক্যান্সার রোগীদের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করবে।
গবেষণা ও চিকিৎসা শিক্ষা
গবেষণা খাত: চিকিৎসা বিজ্ঞানের গবেষণায় এবার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও নিজস্ব আয় থেকে সর্বমোট ২৮ কোটি পাঁচ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় সাত কোটি ৭০ লক্ষ টাকা বেশি।
প্রশিক্ষণ ও মেধা বৃত্তি: শিক্ষক, চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ খাতে এবার দুই কোটি ১০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রেসিডেন্সী, নন-রেসিডেন্সী ও নার্সিং শিক্ষার্থীদের বৃত্তি/মেধাবৃত্তি খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে ২২৭ কোটি ৪৭ লক্ষ টাকা করা হয়েছে।
অন্যান্য: বইপত্র ও সাময়িকী ক্রয়ের জন্য অতিরিক্ত এক কোটি ৩০ লক্ষ টাকা এবং পথ্য (রোগীদের খাবার) মান উন্নয়নে বরাদ্দ বাড়িয়ে ১৮ কোটি টাকা করা হয়েছে।
ডিজিটাল হেলথকেয়ার ও ই-গভর্নেন্স (ইএমআর)
বিশ্বের আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে এবার বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল উপায়ে রোগীদের তথ্য সংরক্ষণের জন্য ইলেকট্রনিক মেডিক্যাল রেকর্ড (ইএমআর) চালু করা হচ্ছে। এজন্য নিজস্ব তহবিল থেকে সাত কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এ ছাড়া তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে মোট পাঁচ কোটি টাকা এবং ‘ই-লগ বুক’ উপখাতে এক কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
ঝুঁকিপূর্ণ ভবন অপসারণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন
বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ও জরাজীর্ণ ভবনগুলোর সংস্কার এবং ক্যাম্পাসকে রোগীবান্ধব করতে পূর্ত ও সংরক্ষণ খাতে সর্বমোট ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, রাজউক কর্তৃক ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষিত ‘এ ব্লক’ থেকে শিক্ষার্থীদের নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক মাল্টি-পারপাস আবাসিক হল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যার জন্য দ্রুত ডিপিপি (ডিপিপি) তৈরি করা হবে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (এডিপি) চার হাজার তিনশত আটষট্টি কোটি চৌত্রিশ লক্ষ টাকার নতুন মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে বিএমইউ।
নির্বাচনী ইশতেহার-২০২৬ এর সবার জন্য স্বাস্থ্য নীতি, দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্য সেবা এবং বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ওপর ভিত্তি করে উচ্চ অগ্রাধিকার প্রাপ্ত কয়েকটি নতুন প্রকল্প গুচ্ছ আকারে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচীতে (সবুজ পাতায়) অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো-
১. বেতার ভবন এরিয়ায় অ্যাক্রেডিটেড ল্যাব, রিসার্স সেন্টার ও প্রশাসনিক ভবন নির্মাণ প্রকল্প: প্রাক্কলিত ব্যয় তিন হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা (বৈদেশিক সাহায্য- ২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা)। বাস্তবায়ন কাল: জুলাই ২০২৬ – জুন ২০৩১।
২. বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার স্থাপন: প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৩.৮৬ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন কাল: জুলাই ২০২৬ – জুন ২০২৮।
৩. সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল হেপাটোবিলিয়ারী এবং লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার স্থাপন: প্রাক্কলিত ব্যয় ৪৩.৯৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন কাল: জুলাই ২০২৬ – ডিসেম্বর ২০২৮।
৪. কেন্দ্রীয় স্টেম সেল ও গবেষণাগার কেন্দ্র স্থাপন (ডেন্টাল ও বায়োমেডিক্যাল): প্রাক্কলিত ব্যয় ৩০৪.০০ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন কাল: জুলাই ২০২৬ – জুন ২০২৯।
৫. জনসংখ্যা ভিত্তিক জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রীনিং কর্মসূচী (২য় পর্যায়): প্রাক্কলিত ব্যয়: ১৮৮.৪৯ কোটি টাকা। বাস্তবায়ন কাল: জুলাই ২০২৬ – জুন ২০৩০।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিএমইউ প্রো-ভিসি (একাডেমিক) অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম, প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ, প্রো-ভিসি (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদারসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।


