Saturday, June 6, 2026
Google search engine
Homeজাতীয়আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ, বাস্তবায়ন কোন পথে?

আগামী অর্থবছরে স্বাস্থ্যে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ, বাস্তবায়ন কোন পথে?

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ প্রায় দ্বিগুণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। নতুন এডিপিতে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
নতুন এডিপি অনুযায়ী, মোট উন্নয়ন বাজেটের ১১ দশমিক ৮৬ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। পরিবহন ও যোগাযোগ এবং শিক্ষা খাতের পর স্বাস্থ্য খাতেই তৃতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে, গত বাজেটে ছিল ১৮ হাজার ১৪৮ কোটি টাকা।
তবে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন দুই বিভাগের বাজেট বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সূত্রের তথ্য মতে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ মিলে ব্যয় করেছে মাত্র ৯৩৩ কোটি টাকা। অথচ এ সময় তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল ১২ হাজার ৮৮৪ কোটির বেশি। অর্থাৎ মোট বরাদ্দের এক-দশমাংশেরও কম ব্যয় হয়েছে।
এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশে স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় জিডিপির ১ শতাংশের নিচে রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন এ ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার সুপারিশ করেছিল। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও একই লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরেই সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

চলতি মাসেই বিএনপি সরকারের প্রথম বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। এর আগে গত ১৯ মে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ (এনইসি) তিন লাখ নয় হাজার কোটি টাকার এডিপি অনুমোদন দেয়। স্বাস্থ্যে এডিপির মোট ৩৫ হাজার ৫৩০ কোটি টাকার মধ্যে ২৬ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আর স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ পাবে আট হাজার ২২১ কোটি টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫০৩ কোটি টাকা।

উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়
তবে চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা সংস্থাগুলোর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগ। এ কারণে সংশোধিত এডিপিতে তাদের মূল বরাদ্দের ৬৫ শতাংশের বেশি কমিয়ে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, এপ্রিল পর্যন্ত স্বাস্থ্যের বিভাগ দুটি সংশোধিত বরাদ্দের মাত্র ২০ শতাংশ ব্যয় করতে সক্ষম হয়েছে।

সরকারের মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন ডিভিশনের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে দুই বিভাগে বিভক্ত করার পর থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর ছাড়া কোনো বছরই বিভাগ দুটি জাতীয় গড় বাস্তবায়ন হার অর্জন করতে পারেনি। ওই অর্থবছরেও কেবল স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগ সামান্য ব্যবধানে জাতীয় গড় বাস্তবায়ন হার অতিক্রম করেছিল।

বরাদ্দের সঙ্গে অর্থ ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বাড়ানোর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুর্বল বাস্তবায়ন সক্ষমতা, জটিল ক্রয় ও অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং পুরোনো বাজেট ব্যবস্থাপনার কারণে স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়ন ব্যয় কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই হবে না, বরং অর্থ ব্যবস্থাপনা দক্ষতা বৃদ্ধি ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করেন তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমরা দীর্ঘদিন ধরে স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলাম। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকেও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বাজেট বৃদ্ধির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তবে বাজেট বাড়ানোর পাশাপাশি এর কার্যকর ও যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত অর্থবছরে এডিপিতে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ ব্যয়ই করা যায়নি, যা উদ্বেগের বিষয়।

ব্যয়ে অপচয়-অনিয়ম রোধ না হলে ফল আসবে না
তিনি বলেন, ‘বাজেট বড় হতে হবে। তবে সেই বাজেট জনকল্যাণে যথাযথভাবে ব্যয়ও করতে হবে। বড় বাজেট বরাদ্দ দিয়ে যদি অপচয় বা অনিয়মের মাধ্যমে অর্থ ব্যয় করা হয় এবং জনগণ তার সুফল না পায়, তাহলে সেই বাজেটের কোনো ফলাফল থাকবে না।

তার মতে, স্বাস্থ্যখাত উন্নয়নের জন্য তিনটি বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে—পর্যাপ্ত বরাদ্দ, বরাদ্দের শতভাগ বাস্তবায়ন এবং জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ।
তিনি আরও বলেন, ‘বাজেট বাস্তবায়নের পথে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে, সেগুলো দূর করে জনগণের উপকারে আসে—এমন খাতে অর্থ ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। কেবল অর্থ ব্যয় হলেই হবে না বরং সেই ব্যয় যদি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে কিছু আমলা, ঠিকাদার বা স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর সুবিধা নিশ্চিত করে, তাহলে বড় বাজেটের কোনো মূল্য নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘রাষ্ট্রের অর্থ রাষ্ট্রের জনগণের। তাই বাজেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব সরকারের। বাজেট বাস্তবায়নে যেন কোনো ধরনের অপচয়, অনিয়ম বা দুর্নীতি না হয়, সে বিষয়ে সরকারকেই কঠোর নজরদারি করতে হবে।

অবকাঠামোয় বাজেট বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা
অবকাঠামোগত খাতে বাজেট বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে উপযুক্ত প্রকল্প পরিচালক না পাওয়া একটি বড় সমস্যা। এই খাতে চিকিৎসকদের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু অবকাঠামো উন্নয়ন, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা ও প্রকল্প পরিচালনার মতো বিষয়ে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় না।

যোগ্য ও সৎ চিকিৎসকদের অনেকেই প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হন না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর কারণ হলো, এ দায়িত্বের সঙ্গে অতিরিক্ত সুবিধা বা ভাতা নেই। অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রভাব বা বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনেক সময় এসব পদে আসতে আগ্রহী হন, যদিও তাদের সবাই প্রয়োজনীয় দক্ষতার অধিকারী নন।

প্রকল্প পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন অধ্যাপক আব্দুল হামিদ। বলেন, ‘প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের পর তাকে এবং তার টিমকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। সাভারে নির্মাণাধীন হেলথ কেয়ার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটে (এইচএসসিএমআই) অন্তত এক মাসব্যাপী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। একজন প্রকল্প পরিচালককে প্রশাসনিক জটিলতা, রাজনৈতিক চাপ এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হয়। তাই তাদের দক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ অপরিহার্য।

প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার অপরিহার্যতার কথা উল্লেখ করে এই স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘যদি কোনো প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ বছর হয়, তাহলে এমন কর্মকর্তাকে প্রকল্প পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে, যার চাকরির মেয়াদ অন্তত সাত বছর অবশিষ্ট রয়েছে। ঘন ঘন প্রকল্প পরিচালক পরিবর্তন হলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ অবশ্যই যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে দিতে হবে। আমাদের দেশে অনেক সময় দক্ষতার পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবের ভিত্তিতে কাজ দেওয়া হয়, যা প্রকল্পের মান ও গতি—উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

প্রশাসনিক জটিলতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সিস্টেমের বিভিন্ন দুর্বলতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অডিট ও হিসাব-সংক্রান্ত প্রক্রিয়ার জটিলতায় প্রকল্পের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়, যা উন্নয়ন কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে।

অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ বলেন, ‘বরাদ্দের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সরকারকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো যেন দ্রুত সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আসে, সে জন্য কার্যকর মনিটরিং ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে এ বিষয়ে আরও তৎপর হতে হবে, যাতে বাস্তব সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত ও সমাধান করা যায়।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments