Wednesday, July 15, 2026
Google search engine
Homeজাতীয়দেশে মানসিক সমস্যায় ভুগছে ১৪% শিশু-কিশোর: কিশোরবান্ধব সেবায় ভিপিএল মডেল অন্তর্ভুক্তির আহ্বান

দেশে মানসিক সমস্যায় ভুগছে ১৪% শিশু-কিশোর: কিশোরবান্ধব সেবায় ভিপিএল মডেল অন্তর্ভুক্তির আহ্বান

হেল্থ ইনফো ডেস্ক :
বাংলাদেশে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে কমিউনিটিভিত্তিক ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার (ভিপিএল) মডেলকে কার্যকর ও টেকসই উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেছেন সাংবাদিক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মীরা। কিশোর-কিশোরীদের সহজলভ্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও যুববান্ধব মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে কৈশোরবান্ধব সেবা কেন্দ্রে (এএফএইচসিএস) ভিপিএল মডেল অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান তারা। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার উচ্চহার, চিকিৎসাসেবার ঘাটতি এবং সীমিত বরাদ্দের প্রেক্ষাপটে সহজলভ্য ও ব্যয়-সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় ভিপিএল মডেল বাড়ানোর দাবিও জানান তারা।

আজ সোমবার (১৩ জুলাই) রাজধানীতে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেলের কার্যকারিতা, অপরিহার্যতা নিয়ে সাংবাদিকদের নিয়ে আয়োজিত সংলাপে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। জিএইচএআই অ্যাডভোকেসি অ্যাক্সিলারেটর’র সহযোগিতায় এর আয়োজন করে সিরাক-বাংলাদেশ।

দেশে মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের ব্যাপকতা ও চিকিৎসার অপ্রতুলতা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরে সংশ্লিষ্টরা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রাপ্তবয়স্ক প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ মানুষ (১৬.৮ শতাংশ) এবং ১৩.৬ শতাংশ শিশু ও কিশোর-কিশোরী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত। উদ্বেগজনকভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চিকিৎসা ঘাটতি ৯২.৩ শতাংশ। দেশে প্রতি এক লাখ মানুষের জন্য মাত্র ০.০৭৩ জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এবং ০.১২ জন মনোবিজ্ঞানী রয়েছেন। অন্যদিকে, জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটের মাত্র ০.৪৪ শতাংশ মানসিক স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ হওয়ায় মানসম্মত ও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

এই প্রেক্ষাপটে অংশগ্রহণকারীরা কিশোর-কিশোরীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ভিপিএল মডেলকে একটি কার্যকর, ব্যয়-সাশ্রয়ী এবং টেকসই উদ্যোগ হিসেবে অভিহিত করেন।

অনুষ্ঠানে তিনজন ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মাঠপর্যায়ে তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে কাজ করার বাস্তব অভিজ্ঞতা ও শেখার বিষয়গুলো অংশগ্রহণকারীদের সঙ্গে ভাগাভাগি করেন।

উদ্বোধনী বক্তব্যে ভিপিএল মডেলের প্রয়োজনীয়তা, এর বাস্তবায়ন অভিজ্ঞতা এবং নীতিগতভাবে প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের গুরুত্ব তুলে ধরেন সিরাক-বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এস. এম. সৈকত।

তিনি বলেন, করোনাভাইরাস মহামারির পর মানুষের প্রযুক্তিনির্ভরতা ও ঘরে অবস্থানের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের সঙ্গে সমন্বিতভাবে একটি পাইলট উদ্যোগ নেওয়া হয়। যেহেতু দেশের ১,৩৮০টির বেশি সেবাকেন্দ্রের মধ্যে ১,২৫৩টিই পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়, তাই তাদের সহযোগিতায় চারটি জেলায় ২০টি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে পরীক্ষামূলকভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।

‘এই পাইলট কার্যক্রমে নগর, শিল্পাঞ্চল, বিভাগীয় শহর ও প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চল—সব ধরনের এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর মধ্যে ছিল ঢাকা মহানগর, নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চল, ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহর এবং নেত্রকোণার মদন উপজেলার প্রত্যন্ত ফতেপুর ইউনিয়নের মতো হাওরাঞ্চল। তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উপকূলীয় অঞ্চল এই উদ্যোগের বাইরে রাখা হয়। সমতল অঞ্চলে এই কার্যক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রস্তাবিত হস্তক্ষেপের কার্যকারিতা ও অভিজ্ঞতা মূল্যায়ন করাই ছিল মূল উদ্দেশ্য। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ইউএসএআইডি কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করে’—যোগ করেন তিনি।

তিন বছরব্যাপী পাইলট কার্যক্রমের ফলাফল তুলে ধরে এস. এম. সৈকত বলেন, কার্যক্রম চলাকালে প্রতি তিন মাস অন্তর সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের প্রতিনিধিদের নিয়ে পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় গত তিন মাসে কিশোর-কিশোরীদের সেবা গ্রহণের প্রবণতা, কার্যক্রমের অগ্রগতি, সেবা বৃদ্ধি বা হ্রাসের কারণ এবং বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ নিয়ে নিয়মিত পর্যালোচনা ও সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ধারাবাহিক এই মূল্যায়ন ও ট্রাবলশুটিংয়ের মাধ্যমেই কার্যক্রমের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ফলাফল স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

গোলটেবিলের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বের সঞ্চালনা করেন এস. এম. সৈকত।

সিরাক-বাংলাদেশের প্রজেক্ট ম্যানেজার মো. নাজমুল হাসান একটি প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি, ভিপিএল মডেলের কার্যক্রম, অর্জিত ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উপস্থাপন করেন।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সিরাক-বাংলাদেশের প্রোগ্রাম লিড শাহীনা ইয়াসমিন, উপ-পরিচালক (প্রোগ্রাম) মো. সেলিম মিয়া, প্রোগ্রাম ম্যানেজার সংগীতা সরকার, প্রজেক্ট ম্যানেজার লুৎফা পাঠান, অ্যাডভোকেসি স্পেশালিস্ট মিজানুর রহমান পাভেল, অ্যাসোসিয়েট ফাইন্যান্স অ্যান্ড অ্যাডমিন মো. নাজমুল ইসলাম এবং কমিউনিকেশন অফিসার এনামুল হক রনি।

আলোচনায় অতিথিরা বলেন, কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যকে বাল্যবিবাহ, মাদকাসক্তি, সহিংসতা এবং অন্যান্য সামাজিক ঝুঁকির সঙ্গে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ ধরনের বিষয়গুলোতে সচেতনতা সৃষ্টির কার্যক্রম বিদ্যালয় পর্যায় থেকেই শুরু করা উচিত এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে এ বিষয়ে একটি কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। তারা উল্লেখ করেন, খাদ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতোই বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্য এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে জানা ও সেবা পাওয়া কিশোর-কিশোরীদের মৌলিক অধিকারের অংশ হওয়া উচিত।

অংশগ্রহণকারীরা আরও বলেন, ১৩-১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের বিদ্যমান সেবাব্যবস্থার পাশাপাশি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেল বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। এতে সরকারি উদ্যোগের পরিপূরক হিসেবে কমিউনিটি পর্যায়ে সহজলভ্য ও কার্যকর মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ সম্ভব হবে।

এ ধরনের উদ্যোগের সফল বাস্তবায়নে গণমাধ্যমের ভূমিকার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন বক্তারা। তারা বলেন, কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের শুরু থেকেই গণমাধ্যমকর্মীদের আরও সম্পৃক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে ইতিবাচক, তথ্যভিত্তিক ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের ভিপিএল মডেল সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

আলোচনায় উল্লেখ করা হয়, ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেল শুধু স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করতেই নয়, বরং তরুণদের নেতৃত্ব, যোগাযোগ, দলগত কাজ, অ্যাডভোকেসি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণে অংশগ্রহণকারীরা কৈশোরবান্ধব সেবা কেন্দ্রগুলোতে ভলান্টিয়ার পিয়ার লিডার মডেলকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকারের নীতিগত অঙ্গীকার, আন্তঃখাত সমন্বয় এবং পর্যাপ্ত সম্পদ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments