হেলথ ইনফো ডেস্ক :
সারাদেশে হামের সংক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ ঝুঁকির সতর্কতা জারি করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। টিকার ঘাটতি ও অবহেলার কারণেই হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পেয়েছে বলে অভিযোগ করেছে প্রতিষ্ঠানটি। গত ২৩ এপ্রিল এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলেছে ডব্লিউএইচও।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গত ৪ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিধি (আইএইচআর) অনুযায়ী ডব্লিউএইচওকে জানায়, দেশের আটটি বিভাগের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলাতেই হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ১৫ মার্চ থেকে চলতি মাসের ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ১৯ হাজার ১৬১টি সন্দেহভাজন হাম রোগী এবং দুই হাজার ৮৯৭টি পরীক্ষায় নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হাম-সম্পর্কিত ১৬৬ জনের মৃত্যু হয়েছে, যার মৃত্যুহার শূন্য দশমিক নয় শতাংশ। আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু।
এদিকে পরিস্থিতি মোকাবিলায় ৫ এপ্রিল থেকে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে সরকার। পাশাপাশি রোগ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং জোরদার করতে সারাদেশে নজরদারি ও মহামারি বিশ্লেষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ডব্লিউএইচও বলছে, বহু বিভাগে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া, বিপুলসংখ্যক ঝুঁকিপূর্ণ শিশু, টিকাদানে ঘাটতি এবং মৃত্যুর ঘটনা বিবেচনায় বাংলাদেশে হাম পরিস্থিতির ঝুঁকি এখন জাতীয় পর্যায়ে ‘উচ্চ’।
ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে গত জানুয়ারি থেকে হামের সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। বর্তমানে দেশের ৯১ শতাংশ জেলায় এই রোগের বিস্তার ঘটেছে, যা জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক সংক্রমণের ইঙ্গিত দেয়। সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা পাওয়া গেছে ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও খুলনা বিভাগে। বিশেষ করে ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি ও নিম্নআয়ের এলাকায়— যেমন ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁওয়ে সংক্রমণ বেশি দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া আক্রান্তের ঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি রয়েছে শিশুরা। হাম আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। এর মধ্যে ৬৬ শতাংশ শিশু দুই বছরের কম বয়সী এবং ৩৩ শতাংশ শিশু নয় মাসের কম বয়সী, অর্থাৎ যাদের টিকা নেওয়ার বয়সও হয়নি। একই সঙ্গে মৃত্যুর অধিকাংশ ঘটনাই ঘটেছে টিকা না পাওয়া দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাস বা আক্রান্ত ব্যক্তির নাক-মুখের ড্রপলেটের মাধ্যমে ছড়ায়। সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে সাধারণত উচ্চ জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া, কাশি এবং মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ দেখা দেয়। পরে সারা শরীরে ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত রোগীরা দুই থেকে তিন সপ্তাহে সেরে উঠলেও হাম থেকে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, কানের সংক্রমণ, মস্তিষ্কে প্রদাহ, অন্ধত্ব এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।
হামের সংক্রমণ বৃদ্ধির নেপথ্যে টিকাদানে ঘাটতিই ‘বড় কারণ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে ডব্লিউএইচও। সংস্থাটি জানিয়েছে, বাংলাদেশ অতীতে হাম নির্মূলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করলেও ২০২৪-২৫ সালে এমআর টিকার ঘাটতি, নিয়মিত টিকাদানে দুর্বলতা এবং ২০২০ সালের পর বড় আকারের টিকাদান অভিযান না হওয়ায় বিপুলসংখ্যক শিশু ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এ কারণেই দেশে আবার বড় আকারে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
তবে সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। গত ৫ এপ্রিল ১৮ জেলার ৩০ উপজেলায় লক্ষ্যভিত্তিক এমআর টিকাদান শুরু হয়, যা গত ২০ এপ্রিল সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল (আরআরটি) সক্রিয় করেছে সরকার। এ ছাড়া হাসপাতাল প্রস্তুতি ও আইসোলেশন ব্যবস্থা জোরদার, ভিটামিন ‘এ’ সরবরাহ নিশ্চিত করা, রোগ শনাক্তকরণ ও রিপোর্টিং জোরদার করা হয়েছে বলেও উঠে এসেছে ডব্লিউএইচওর প্রতিবেদনে।
ডব্লিউএইচওর মতে, অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশে হামের সংক্রমণ আরও বাড়বে, এমনকি সীমান্তবর্তী এলাকা ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের মাধ্যমে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ঝুঁকি বেশি।
এ অবস্থায় অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকা নিশ্চিত করা, সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যকর্মী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকেও টিকার আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে বর্তমানে এই প্রাদুর্ভাবের কারণে ভ্রমণ বা বাণিজ্যে কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুপারিশ করা হয়নি।