Take a fresh look at your lifestyle.

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসার অঙ্গীকার মন্ত্রীর

৬৪

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
দেশে হঠাৎ করে হাম বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পরিণত হয়েছে জানিয়ে এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপের তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি শূন্যে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে, এ ব্যাপারে সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি। আলোচনায় দেশের অগ্রগতিতে ওষুধ শিল্পের ভূমিকা ভূয়সী প্রশংসা করেন মন্ত্রী। এ ছাড়া নীতিগত সহায়তা, দুর্নীতিমুক্ত ব্যবস্থাপনা ও ওষুধ শিল্পের উন্নয়ন ছাড়া স্বাস্থ্যখাতকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয় বলে মত দেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

আজ রোববার (২৮ মার্চ) সকালে রাজধানীর পূর্বাচলে বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ এক্সিবিশন সেন্টারে ১৭তম এশিয়া ফার্মা এক্সপোর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি ও জিপিইএক্সপো (এফজেডই) যৌথভাবে এই এক্সপোর আয়োজন করে।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, গত ১৫ দিন হাম বড় ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। অধিক সংখ্যক রোগীকে রাজধানীর সংক্রামক ব্যাধি, শিশু হাসপাতাল ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ভেন্টিলেটরের অভাবে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ১১ দিনে ৩৩ জন শিশু মারা গেছে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, প্রতিমন্ত্রী, সচিবসহ স্বাস্থ্যখাতের কেউ এই সংকটের কথা জানতেন না। মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানতে পেরেছি। জানলে হয় তো কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যেত।’

ওষুধ খাত একটি মানবিক ব্যবসা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ দেশের ওষুধ উৎপাদনকারীরা জীবনরক্ষকারী ওষুধ উৎপাদন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এই খাতের সহযোগিতা ছাড়া স্বাস্থ্যসেবাকে কার্যকরভাবে চালানোর কোনো উপায় নেই। এই খাতের সংশিষ্টদের সাথে বসে এই খাতে যে সব সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ রয়েছে তা সামধান করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেবো।

এ সময় স্বাস্থ্যসেবায় ফার্মাকিউটিক্যালস কোম্পানিগুলোর অবদানের প্রশংসা করেন তিনি। বলেন, আপনারা মানুষের জীবন সুরক্ষার জন্য ভূমিকা রাখেন।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প সারা পৃথিবীতে গর্ব করার মতো জায়গায় রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বিশ্ব যেখানে ব্যর্থ, সেখানে আপনারা সার্থক।’

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশের জলাতঙ্কের টিকা ছিল শূন্যের কোঠায়। পরে ইনসেপটা কোম্পানিকে জানানোর পর ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

এ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সেক্ষেত্রে আপনাদের সহযোগিতা লাগবে। কাউকে দুর্নীতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে হবে। এর বিরুদ্ধে কেউ কথা না বললে কে কথা বলবে?

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার ৫৫ বছরেও যদি আমরা করবো করবো করি, তাহলে কারা আসলে দেশের পতাকাকে এগিয়ে নেবে। দেশটা যদি শেষ হয়ে যায়, আমরা যদি ভেঙে পড়ি, মানুষের কাছে যদি মানসম্মত ওষুধ তুলে দিতে না পারি, তাহলে দেশটাকে এগিয়ে নিতে পারবো না।’

ফার্মাসহ স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ভালোভাবে চালানো কঠিন বলে জানান সরদার সাখাওয়াত হোসেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির (বাপি) সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বিশ্বে বাংলাদেশে ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ওষুধ রপ্তানি করছে। ওষুধ উৎপাদনে বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এপিআই শিল্পে আরো এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের পলিসিগতভাবে এগিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। নীতিগত পরিবর্তন হলে এই খাত আরো এগিয়ে যাবে।’

বাংলাদেশে ভারতসহ যে কোনো দেশের তুলনায় ওষুধের দাম কম রয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, এই খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে হবে। এ শিল্পে বাংলাদেশ ভারত ও চীনের সঙ্গে এগিয়ে যেতে চায়।

এই খাত এগিয়ে নিতে সরকারের নজর দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন বাপি সভাপতি। বলেন, তা না হলে দেশের ওষুধ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরই মধ্যে ৩০টি কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে গেছে। কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে নিতে তীক্ষ্ণ নজরদারি করা উচিত।

আব্দুল মুক্তাদির বলেন, সারা বিশ্বে জ্বালানি সংকটের কারণে আমেরিকাসহ অনেক দেশের ঔষধের দামে তীব্র প্রভাব পড়লেও বাংলাদেশে তা হয়নি। রোগীদের কাছে প্রয়োজনীয় ওষুধ পৌঁছাতে পারছে বাংলাদেশ। ফলে তাদের কোনো ভোগান্তি হচ্ছে না।

এ সময় ফার্মা খাতের সমস্যা সমাধানে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা কামনা করেন বাপি সভাপতি।

মানসম্মত ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করছে জানিয়ে এটা আরও বড় পরিসরে করতে সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা কামনা করেন আব্দুল মুক্তাদির।

গণমাধ্যমের অপপ্রচারের জন্য ওষুধ খাতের ক্ষতি হয়ে জানিয়ে এ শিল্পের ধারা অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় তথ্য জেনে গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ট সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব মোহাম্মদ কামরুজ্জামান চৌধুরী কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, এটি শুধু প্রদর্শনী নয়, বাংলাদেশে ফার্মাসিখাতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার একটি প্রক্রিয়া। এশিয়া ফার্মা এক্সপোর মতো আয়োজনে আমাদের জ্ঞানের আদান-প্রদান হয়। বর্তমান সরকার ফার্মা সেক্টরের উন্নয়নে সব ধরনের সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ খাততে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। বর্তমান সময়ে এই খাতকে আরো সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখছে উদ্যোক্তারা।

তিনি বলেন, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম ছিল। বাকি ৮০ শতাংশ ছিল আমদানি নির্ভর। বর্তমানে ওষুধের মোট চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পৃথিবীর ১৫৭টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মো. শামীম হায়দার শামীম হায়দার বলেন, বাংলাদেশের ওষুধ ১২২টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে। বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে পরিসর পর্যায়ক্রমে বাড়ছে। বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প গুণগত ও কার্যকারিতায় রক্ষা করছে। সেইসঙ্গে সুনাম ধরে রাখার জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে রাখবে।

তিনি বলেন, স্বাধীনতাপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ চাহিদার মাত্র ২০ শতাংশ ওষুধ উৎপাদনে সক্ষম ছিল। বাকি ৮০ শতাংশ ছিল আমদানিনির্ভর। বর্তমানে ওষুধের মোট চাহিদার প্রায় ৯৮ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। পাশাপাশি নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে পৃথিবীর ১৫৭টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন বাপি মহাসচিব এবং ডেলটা ফার্মা লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. মো. জাকির হোসেন। এ ছাড়া আয়োজকদের পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন জিপিই এক্সপো লি. এর সিইও পারেশ জুরমারভালা।

সবশেষে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল ফিতা কেটে ১৭তম এশিয়া ফার্মা এক্সপোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। এ ছাড়াও বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির পক্ষ থেকে প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিদের শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়। পরে বিভিন্ন স্টল পরিদর্শন করেন মন্ত্রী।

উদ্বোধনী দিনের আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ হাসান আরিফ। আরও অংশগ্রহণ করেন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, শিল্পখাতের নেতৃবৃন্দ, ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন খাতের শীর্ষ প্রতিনিধিরা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিরা।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এই প্রদর্শনীটি ২৯, ৩০ ও ৩১ মার্চ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এটি হবে সোর্সিং, নেটওয়ার্কিং, প্রযুক্তি মূল্যায়ন এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্লাটফর্ম।

প্রসঙ্গত, এশিয়া ফার্মা এক্সপো গত ২৩ বছরের ঐতিহ্য ধরে দেশের দ্রুত বর্ধনশীল ফার্মাসিউটিক্যাল খাতে উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও শিল্প উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এবারের আয়োজনে ডেনমার্ক, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইতালি, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, ভিয়েতনাম, আয়ারল্যান্ড ও ভারতসহ ২০টিরও বেশি দেশের ৪০০-এর অধিক প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করেছে। ফার্মা এক্সপোতে ফার্মাসিউটিক্যাল প্রসেসিং, প্যাকেজিং, এপিআই ও এক্সিপিয়েন্টস, অ্যানালিটিক্যাল ও ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতি, ক্লিনরুম ও এইচভিএসি সিস্টেম, পানি ব্যবস্থাপনা এবং টার্নকি প্রজেক্ট সেবাসহ এই খাতের নানান ধরনের নতুন নতুন প্রযুক্তি প্রদর্শিত হবে।

২০০৩ সাল থেকে এশিয়া ফার্মা এক্সপো ও এশিয়া ল্যাব এক্সপো ফার্মাসিউটিক্যাল উৎপাদন সরবরাহ চেইনের পূর্ণাঙ্গ কাভারেজসহ অঞ্চলের একমাত্র বিশেষায়িত প্রদর্শনী হিসেবে পরিচিত। এটি উদ্যোক্তা, গবেষণা ও উন্নয়ন (আরডি) বিশেষজ্ঞ এবং কর্পোরেট সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীদের জন্য নতুন যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, প্যাকেজিং সমাধান এবং ল্যাব প্রযুক্তি অন্বেষণের সুযোগ তৈরি করে। বিগত বছরগুলোতে এই প্রদর্শনীগুলো প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও শিল্প আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং বাংলাদেশকে আমদানি নির্ভর বাজার থেকে উচ্চমানের জেনেরিক ওষুধ রপ্তানিকারক দেশে রূপান্তরে সহায়তা করেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.