হেলথ ইনফো ডেস্ক :
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির একটি ছোট কক্ষে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) স্থাপিত, যেখানে জেনারেল থেকে শুরু করে সব ধরনের সার্জিক্যাল অপারেশন সম্পন্ন করা হয়। তবে চিকিৎসকদের বসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিতে কোনো নিরাপত্তা প্রহরীও নেই। নারী চিকিৎসকেরা রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। ক্লিনার রয়েছেন মাত্র একজন, আর প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তাদের জন্য নেই কোনো পিয়ন বা আয়া—এভাবেই জাতীয় সংসদে নিজের নির্বাচনী এলাকার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের বেহাল চিত্র তুলে ধরেন ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. কামরুল হাসান।
আজ মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের পঞ্চম দিনের কার্যসূচি অনুযায়ী, বিধি ৭১-এর আওতায় জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মনোযোগ আকর্ষণের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকা ময়মনসিংহ-৬ (ফুলবাড়িয়া) একটি পশ্চাৎপদ উপজেলা। এখানে চারটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে। আমার জানামতে, সারা বাংলাদেশে উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে কমপক্ষে দোতলা অথবা চারতলা ভবন রয়েছে। কিন্তু আমার নির্বাচনী এলাকায় চারটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের মধ্যে একটি, যা ফুলবাড়িয়া পৌর অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে এক একর জমির ওপর অবস্থিত, সেটি বেদখল হওয়ার পথে। সেখানে পাকা ভবন নির্মাণ না করার কারণে দীর্ঘদিনের পুরোনো একটি টিনশেড ভবন রয়েছে। বর্তমানে সেই টিনশেডে পানি পড়ে, ডাক্তার বসার কোনো জায়গা নেই এবং জমিটি বেহাত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।’
তিনি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ‘এই এক একর জমিতে বাউন্ডারি ওয়ালসহ চারতলা বিশিষ্ট একটি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র নির্মাণ করা অত্যন্ত প্রয়োজন। একই সঙ্গে আমার এলাকায় ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক রয়েছে, কিন্তু সেগুলোতে পর্যাপ্ত জনবলের অভাব রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘অতি দ্রুত আমার উপজেলায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
এ বিষয়ে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দিতে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে আহ্বান জানান। জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘বর্তমান সরকারের নির্বাচন ইশতেহার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যা পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বিগত সতেরো বছর স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়নি। পূর্ববর্তী সরকারের সীমাহীন দুর্নীতির কারণে স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন অবকাঠামো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি, ফলে চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে এবং অনেক স্থাপনা ভেঙে পড়েছে। এতে স্বাস্থ্য খাত স্থবির হয়ে পড়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ফুলবাড়িয়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রটি ১৯৬৫ সালে নির্মিত একটি টিনশেড স্থাপনা। গত দেড় দশকে এতে কোনো সংস্কার কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। বর্তমান সরকার স্বাস্থ্য খাতকে যুগোপযোগী করতে বদ্ধপরিকর। আগামী অর্থবছরে ফুলবাড়িয়া উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ শুরু করার বিষয়টি বিবেচনাধীন রয়েছে। এ বিষয়টি তুলে ধরার জন্য তিনি ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্যকে ধন্যবাদ জানান।’
পরে মন্ত্রীর বক্তব্যের উপর প্রশ্ন করার জন্য স্পিকার পুনরায় ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্যকে ফ্লোর দেন। তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি পৌরসভা থেকে অনেক দূরে অবস্থিত। সেখানে অপারেশন থিয়েটার (ওটি) চালু রয়েছে এবং অধিকাংশ অপারেশন সেখানে সম্পন্ন হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, ৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রায় ১০০ রোগী ভর্তি থাকে এবং প্রতিদিন প্রায় এক হাজার রোগী আউটডোর সেবা গ্রহণ করে।’
কামরুল হাসান বলেন, ‘ওটি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটির একটি ছোট কক্ষে অবস্থিত, যেখানে জেনারেল অপারেশন থেকে শুরু করে সার্জিক্যাল সব ধরনের অপারেশন করা হয়। কিন্তু ডাক্তারদের বসার কোনো জায়গা নেই। পাশাপাশি, সেখানে একজন নিরাপত্তা প্রহরীও নেই। নারী চিকিৎসকরা রাত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু তাদের নিরাপত্তার জন্য কোনো প্রহরী নেই। ক্লিনার রয়েছে মাত্র একজন। একজন প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তার জন্য কোনো পিয়ন বা আয়া নেই।’
তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে হাসপাতালটিকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবি জানান। এছাড়া তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার কোনো যানবাহন নেই, ফলে ৫৩টি কমিউনিটি ক্লিনিক পরিদর্শনে সমস্যা হচ্ছে। এ অবস্থায় তিনি যানবাহনের ব্যবস্থা এবং হাসপাতালটিকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ময়মনসিংহ-৬ আসনের সংসদ সদস্য যে সমস্যাগুলো তুলে ধরেছেন—যেমন অ্যাম্বুলেন্সের অভাব, সন্ধ্যার পর ডাক্তারদের নিরাপত্তার অভাব, চিকিৎসকদের বসার জায়গার সংকট, রোগীর চাপ বৃদ্ধি এবং ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ২০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রয়োজন—এসবই বাস্তবসম্মত এবং যথার্থ। এই সমস্যাগুলো শুধু ওই এলাকায় নয়, সারা দেশেই বিদ্যমান।’
সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালের সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার পরিসরও বাড়ানো প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিগত ১৭ বছরে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। জনগণের চাহিদা অনুযায়ী হাসপাতালের সম্প্রসারণ, লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি এবং আসবাবপত্র সরবরাহ করা হয়নি।’
এ সময় তিনি এসব সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ এবং আগামী বাজেটে সমাধানের আশ্বাস দেন।