হেলথ ইনফো ডেস্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে এক বছরে (২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর) দেশে ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে স্বাস্থ্যখাতেই ঘুষ লেনদেন হয়েছে ১৮১.৭ কোটি টাকা। দেশের সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ও ঘুষের শিকার হওয়ার দিক দিয়ে যথাক্রমে ষষ্ঠ ও অষ্টম অবস্থানে রয়েছে স্বাস্থ্যখাত।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডিতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ এর প্রতিবেদন প্রকাশ করে এসব তথ্য তুলে ধরেন নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এটি টিআইবির ১১ তম খানা জরিপ।
টিআইবি জানায়, ২০২৩ সালের প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণের তুলনায় ২০২৫ সালে প্রায় ১৫.৯ শতাংশ (১,৭২৯.৯ কোটি টাকা) ঘুষ লেনদেন বেশি হয়েছে। প্রাক্কলিত মোট ঘুষের পরিমাণ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের জিডিপি’র ০.২৩ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের (সংশোধিত) ১.৫৮ শতাংশ।
প্রতিবেদনে টিআইবি জানায়, পাসপোর্ট সেবায় সর্বোচ্চ ৮৪.৪ শতাংশ গ্রাহক দুর্নীতির এবং ৭৬.৬ শতাংশ ঘুষের শিকার হয়েছেন; অন্যদিকে বিআরটিএ-তে এই দুর্নীতির হার ৭৯.৩ শতাংশ এবং ঘুষের হার ৬৩.৫ শতাংশ। খাতভেদে সেবা গ্রহণে পাসপোর্টে ঘুষের শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৭৯.১ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭১.৮ শতাংশ। এছাড়া খাতভেদে সেবা গ্রহণে পাসপোর্টে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৮৭ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৯.৪ শতাংশ। পাসপোর্ট অফিসের পর বিআরটিএ’তে সেবা খাতগুলোর মধ্যে ঘুষের হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ৬১.৫ শতাংশ ও শহরাঞ্চলে ৬৬.৩ শতাংশ এবং ভৌগোলিক অবস্থানভেদে সেবা গ্রহণে বিআরটিএ-তে দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার গ্রামাঞ্চলে ৮০.৪ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭৭.৭ শতাংশ।
দুর্নীতি ও ঘুষের তালিকায় যথাক্রমে দুর্নীতিতে ষষ্ঠ ও অষ্টম অবস্থানে আছে স্বাস্থ্যখাত। ৬৪.৪ শতাংশ গ্রাহক দুর্নীতি ও ২৯.৭ শতাংশ গ্রাহক ঘুষের শিকার হয়েছেন। খাতভেদে সেবা গ্রহণে স্বাস্থ্যে ঘুষের শিকার হওয়ার হার ভৌগোলিক অবস্থানভেদে গ্রামাঞ্চলে ২৯.৯ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ২৯.৪ শতাংশ। দুর্নীতির শিকার হওয়ার হার গ্রামাঞ্চলে ৬৪.৬ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৬৪.০ শতাংশ।
টিআইবি জানায়, খাতভেদে সেবা গ্রহণে ঘুষের শিকার হওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৪৯.৩ শতাংশ, কৃষি ৪৯.৩ শতাংশ, ভূমি ৪৭.৬ শতাংশ, বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা ৩৯.৬ শতাংশ, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৩৪.৮ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ২৭.৭ শতাংশ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ২১.৯ শতাংশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা ১২.৫ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৬.৮ শতাংশ, গ্যাস ৬ শতাংশ, কর ও শুল্ক ২.৮ শতাংশ, বিমা ২.৭ শতাংশ, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি) ১.৪ শতাংশ এবং এনজিও (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ১.৪ শতাংশ।
এদিকে খাতভেদে সেবা গ্রহণে দুর্নীতির শিকার হওয়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে, বিচার সংশ্লিষ্ট সেবা ৭১.৩ শতাংশ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ৬৯.৪ শতাংশ, ভূমি ৬৬.৩ শতাংশ, কৃষি ৬৪.৪ শতাংশ, শিক্ষা (সরকারি ও এমপিওভুক্ত) ৫২.৫ শতাংশ, জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ৪৭.৪ শতাংশ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ৪৬ শতাংশ, জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ সহায়তা ৪১.৩ শতাংশ, বিদ্যুৎ ৩৬.১ শতাংশ, বিমা ২৫.৬ শতাংশ, গ্যাস ২৫.৪ শতাংশ, ব্যাংকিং (সরকারি ও বেসরকারি) ১৬.৩ শতাংশ, এনজিও (প্রধানত ক্ষুদ্র ও মাঝারি ঋণ) ১৩.১ শতাংশ এবং কর ও শুল্ক ১১.২ শতাংশ।
এ সময় ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সার্বিকভাবে দেশের ৬৩.৬ শতাংশ মানুষ অন্তত একটি খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে। আর সার্বিকভাবে দেশের ৮১.৬ শতাংশ মানুষ সেবা গ্রহণে কমপক্ষে একটি খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে। এর মধ্যে পাসপোর্ট খাতের চিত্রটি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। তবে সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। গত বছরে খানাপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ পাঁচ হাজার ১২৪ টাকা।
তিনি বলেন, দুর্নীতির শিকার হলেও ৬১ দশমিক তিন শতাংশ পরিবার কোনো অভিযোগ করেনি। তাদের মতে, পুরো ব্যবস্থাই দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার প্রায় অর্ধেক পরিবারেরই দুর্নীতির অভিযোগ কোথায় ও কীভাবে করতে হয়, সে বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের এখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সুযোগ থেকেই যাচ্ছে।


