হেলথ ইনফো ডেস্ক :
কোনও শিশুর জন্ম প্রজননতন্ত্র ছাড়াই, কারও নেই পায়ুপথ। অপারেশনে ব্যয় হতে পারে কোটি টাকা। জন্মগত ত্রুটি নিয়ে জন্মানো এমন অনেক শিশুর প্রাণ ফিরিয়ে দিয়েছেন দেশের প্রথম মহিলা পেডিয়াট্রিক সার্জন অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বানু।
খ্যাতিমান প্যাথলজিস্ট ডা. আবদুল মতিনের মেয়ে ডা. তাহমিনা বানু’র জন্ম ১৯৫৮ সালে চট্টগ্রামে।
ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম কলেজ পেরিয়ে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে নেন চিকিৎসাবিদ্যার প্রথম পাঠ। এরপর বাংলাদেশ শিশু স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট থেকে পেডিয়াট্রিক সার্জারিতে স্নাতকোত্তর (এমএস)। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস (বিসিপিএস) থেকে পেয়েছেন এফসিপিএস ডিগ্রি। তিনি রয়্যাল কলেজ অফ সার্জনস অব ইংল্যান্ড এবং রয়্যাল অস্ট্রেলিয়ান কলেজ অব সার্জনসের রোয়ান নিক্স ফেলো।
অস্ট্রেলিয়া এবং আমেরিকায় পেডিয়াট্রিক সার্জন হিসেবে নিয়েছেন প্রশিক্ষণ।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পেডিয়াট্রিক সার্জারি বিভাগে অনেক প্রতিকূলতা অতিক্রম করার গল্প রচনা করেছেন এই গুণী চিকিৎসক। শুরুটা সহজ ছিল না। একজন নারীকে সার্জনের ভূমিকায় দেখাটা তখনকার সময়ে চিন্তা করাও ছিল দুঃসাধ্য।
পুরুষ সহকর্মীরা তখনও ভাবছিলেন- কেন শিশু সার্জারির জন্য একটি পৃথক বিভাগ প্রয়োজন, যেখানে আগে থেকেই অস্ত্রোপচারের জন্য একটি বিভাগ রয়েছে। অন্যদিকে শিশুদের পরিপূর্ণ স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্যে শিশু সার্জারি বিভাগ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অটল ছিলেন ডা. তাহমিনা বানু।
১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে তৎকালীন সরকার শিশু সার্জারি বিভাগ চালু করে এবং ডা. তাহমিনা বানু শিশু সার্জারি বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগ দেন। ওই মাসেই তিনি এক শিশুর এক্সোমফালোস (পেটের একটি বিরল ত্রুটি- যেখানে অন্ত্র, লিভার এবং অন্যান্য অঙ্গগুলো পেটের বাইরে থাকে) এর অস্ত্রোপচার করেন। এই শিশুটি বাংলাদেশের প্রথম বেঁচে থাকা এক্সোমফালোস রোগী।
তাঁর নেতৃত্বে শিশু সার্জারি বিভাগ হাইপোস্প্যাডিয়াস নিয়ে আন্তর্জাতিক সেমিনার, কর্মশালা এবং লাইভ অপারেটিভ ওয়ার্কশপের আয়োজন করে। চট্টগ্রাম উপকূলের কাছে ইউএস নৌ-বাহিনীর সমুদ্রগামী হাসপাতাল মার্সি-তে তিনি বাংলাদেশের কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৬ সালে চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পর শিশু সুরক্ষা এবং কল্যাণের কথা মাথায় রেখে ডা. তাহমিনা বানু প্রতিষ্ঠা করেন চিটাগাং রিসার্চ ইনস্টিটিউট ফর চিলড্রেন সার্জারি (ক্রিক্স)। এই প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন রোগ থেকে শিশুদের সুরক্ষা এবং সর্বোপরি শিশুর সুস্থতার জন্য প্রতিরোধ ও নিরাময় সংক্রান্ত ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে। তিনি ও তাঁর গবেষক দল ক্রিক্স এর মাধ্যমে স্বল্প খরচে অস্ত্রোপচার, স্কুল হেলথ স্ক্রিনিং, সার্জিক্যাল সেবা দিচ্ছেন। এই প্রতিষ্ঠানে যারা চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারে না, তাদের বিনামূল্যে চিকিৎসা প্রদান ও অস্ত্রোপচার করা হয়। তাঁর ‘লো কস্ট কোলাবোরেট’ ফান্ডের মাধ্যমে ইতিমধ্যে তিন শতাধিক রোগীর চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। নিয়মিত তাঁর সঙ্গে গবেষণা কাজে যুক্ত আছেন বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজের ৩০ থেকে ৪০ জন শিক্ষার্থী। সর্বশেষ এক হাজার ৩১৫ জন শিক্ষার্থীর চোখ নিয়ে করেছেন গবেষণা।
শিশু সার্জারি গবেষণায় বিশেষজ্ঞ সার্জন, কিডনি বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞদের নিয়ে তিনি গঠন করেছেন মাল্টি ডিসিপ্লিনারি টিম। এই টিমের সদস্যরা নিয়মিত সভার মাধ্যমে নির্দিষ্ট রোগের ওপর বিষয়ভিত্তিক পর্যালোচনা করেন। প্রতি মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার গবেষণা হয় শিশুর প্রস্রাব ও পায়ুপথের জন্মগত ত্রুটি নিয়ে, দ্বিতীয় শনিবার হিজড়া ও চতুর্থ শনিবার ক্যান্সার এবং থ্যালাসেমিয়া রোগ নিয়ে। সঙ্গে থাকেন রোগী।
চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের শিশু সার্জারি বিভাগে পাঁচ বছরের (জানুয়ারি ২০০৮-ডিসেম্বর ২০১২) গবেষণায় মোট পাঁচ হাজার ৬৬১ জন জন্মগত ত্রুটির শিশুকে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার ১৫৬ জনই ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। অন্যদিকে ৫০৫ জন জন্মগ্রহণ করে একাধিক ত্রুটি নিয়ে। জন্মগত ত্রুটিকে প্রধানত দুইভাগে ভাগ করা হয়। কাঠামোগত (স্ট্রাকচারাল বার্থ ডিফেক্ট) এবং শারীরবৃত্তীয় অকার্যকারিতা (ফাংশনাল বার্থ ডিফেক্ট)। কাঠামোগত জন্মগত ত্রুটি বলতে বুঝায়, কোনো অঙ্গ জন্ম থেকেই অস্বাভাবিক, অকেজো, অসম্পূর্ণ। যেমন: হৃদপিণ্ডের সমস্যা। শারীরবৃত্তীয় অকার্যকারিতা ত্রুটি বলতে বুঝায়- খাদ্যরস পাচিত না হওয়ার কারণে বিপাকীয় সমস্যা, বুদ্ধিবৃত্তির অনুন্নতি, বধির, দৃষ্টিস্বল্পতা ইত্যাদি।
গবেষণায় দেখা যায়, ছেলেশিশুর জন্মগত ত্রুটির সংখ্যা মেয়েশিশুর তুলনায় বেশি। ৫ হাজার ৫৯৮ শিশুর মধ্যে তিন হাজার ৮৩৭ জন ছেলে এবং এক হাজার ৭৬১ জন মেয়ে ত্রুটি নিয়ে জন্মায়। মৃত্যুর হিসাব করলে দেখা যায়, তিন হাজার ৯২১ জন জন্মগত ত্রুটি শিশুর সার্জারি করা হয়। গবেষণাকালেই মারা যায় ২২৫ শিশু। মানবশিশুর মূত্রনালী, জনননালী ও মলদ্বার সৃষ্টির প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। এ ক্ষেত্রে কিছু কিছু শিশু অসম্পূর্ণ পায়ুপথ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। এ ধরনের ত্রুটির দুর্লভ প্রকারটি হলো ‘ক্লোয়েক্যাল ম্যালফরমেশন’। জন্ম নেওয়া প্রতি ৫০ হাজার থেকে সোয়া লাখ শিশু রয়েছে যাদের শরীর থেকে পায়খানা, ঋতুস্রাব ও প্রস্রাব বের হওয়ার স্বাভাবিক পৃথক তিনটি পথ থাকে না।
প্রফেসর ডা. তাহমিনা বানু গবেষণায় প্রমাণ করেছেন, ‘ক্লোয়েক্যাল ম্যালফরমেশন’ নামের জন্মগত শারীরিক ত্রুটি শুধু মেয়েদের নয়, পুরুষেরও হতে পারে। তাঁর এই আবিষ্কার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বানু গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভ ফর চিলড্রেনস সার্জারির প্রেসিডেন্ট। এছাড়া এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব পেডিয়াট্রিক সার্জন্স এর প্রেসিডেন্ট (২০২২-২০২৪), সার্ক পেডিয়াট্রিক সার্জিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি জেনারেলসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের বিভিন্ন সংগঠনে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল সার্জারি কোর্সে একজন ওভারসিজ ফ্যাকাল্টি। দেশি ৬৯টি এবং আন্তর্জাতিক ৭৩টি চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর গবেষণা প্রবন্ধ।
তাঁর উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে-প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা ব্যবহার করে গ্রামীণ শিশুদের অস্ত্রোপচার সেবা প্রদানের জন্য আউটরিচ সার্জিক্যাল প্রোগ্রাম; রোগীদের ভোগান্তি কমানোর জন্য কম খরচের বিভিন্ন কৌশল যেমন: পান পাতা ব্যবহার করে স্টোমার যত্ন, ডিস্ট্যান্ট কোলোগ্রামের পরিবর্তে ব্যানানাগ্রাম ইত্যাদি।
আন্তর্জাতিকভাবে ৩ মার্চ বিশ্ব জন্মগত ত্রুটি দিবস পালন শুরু হয় ২০১৫ সালে। এরপর দেশে প্রথম তিনিই ২০১৬ সাল থেকে এ দিবস পালন শুরু করেন। ৩২ বছর ধরে শত শত জন্মগত ত্রুটিযুক্ত শিশুর চিকিৎসা করেছেন, যারা এখন স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে।
শিশুবন্ধু খ্যাত ডা. তাহমিনা বানু তাঁর ভাই অধ্যাপক ডা. মহসিন জিল্লুর করিম এবং পরিবারের সহায়তায় চন্দনাইশ উপজেলার বরকল গ্রামে গড়ে তুলেছেন ‘ডা. আবদুল মতিন আমরা কমিউনিটি হাসপাতাল’, যেখানে নামমাত্র মূল্যে সব ধরনের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। আছে রোগ নির্ণয়ের ব্যবস্থাও। অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটিতে নেই কোনো দালাল কিংবা ওষুধ কোম্পানির তৎপরতা। চিকিৎসা দেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা। সামর্থহীনদের দেওয়া হয় বিনামূল্যে সেবা। হাসপাতালটি এলাকার গরীব মানুষের একমাত্র আস্থার ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
অধ্যাপক ডা. তাহমিনা বানু বলেন, ‘অপুষ্টি, দারিদ্র্য, পরিবেশ দূষণ, জিনগত সমস্যা ও অসচেতনতার কারণে অনেক শিশু জন্মগতভাবে ত্রুটি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। যার মধ্যে আছে- হার্টের ভাল্বের সমস্যা ও পর্দায় ছিদ্র থাকা, হাত-পায়ের গঠনগত ত্রুটি, ঠোঁট ও তালুকাটা, মাথার খুলি অসম্পূর্ণ থাকা, লিঙ্গ নির্ধারণে জটিলতা, থ্যালাসেমিয়া, থাইরয়েড হরমোনজনিত সমস্যা, মানসিক বিকাশজনিত সমস্যা ইত্যাদি। এসব ত্রুটির মধ্যে অধিকাংশই ৩ মাসের মধ্যে পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। আমি পথশিশু, বস্তির শিশু, অপূর্ণাঙ্গ শিশুদের নিয়ে কাজ করছি। সবার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং মা-বাবার সচেতনতায় এই জটিলতা কমিয়ে আনা সম্ভব’।
শিশুরা বাঁচুক সুস্থভাবে-নির্মল শ্বাসে, হাসির আলোয়। মায়ের গর্ভে থাকুক নিরাপদে, কোমল হাতে ধরা থাকুক আগামীর সূর্য। জন্ম হোক সুস্থভাবে, মানবিক পৃথিবীতে-এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
সূত্র : বাংলানিউজ২৪