শিশুদের হাম (Measles); করনীয় কি?

ফারহানা আফরোজ সীমা :

হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা মূলত শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যায়, তবে টিকা না নেওয়া প্রাপ্তবয়স্করাও এতে আক্রান্ত হতে পারেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির পরও বিশ্বব্যাপী এই রোগ এখনো একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা।

Measles বা হাম হলো একটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণ, যা Measles virus দ্বারা হয়। এটি প্রধানত শ্বাসতন্ত্রকে আক্রান্ত করে এবং খুব দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।

কীভাবে ছড়ায়?
——————-
হাম অত্যন্ত সংক্রামক। এটি ছড়ায়—
১. আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে
২. বাতাসে ভাসমান ভাইরাস কণার মাধ্যমে
৩. আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি থাকলে

একটি আক্রান্ত ব্যক্তি প্রায় ৯০% অ-প্রতিরোধী (unvaccinated) মানুষের মধ্যে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

লক্ষণসমূহ
—————
হামের লক্ষণ সাধারণত সংক্রমণের ১০–১৪ দিনের মধ্যে দেখা দেয়।

প্রাথমিক লক্ষণ:
১. জ্বর
২. সর্দি ও কাশি
৩. চোখ লাল হওয়া (conjunctivitis)
৪. নাক দিয়ে পানি পড়া

বিশেষ লক্ষণ:
১. মুখের ভেতরে ছোট সাদা দাগ (Koplik spots)
২. শরীরে লালচে ফুসকুড়ি (rash), যা মুখ থেকে শুরু হয়ে পুরো শরীরে ছড়ায়

জটিলতা
—————
হাম কখনো কখনো মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে, বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে।
১. নিউমোনিয়া
২. ডায়রিয়া
৩. কানের ইনফেকশন
৪. মস্তিষ্কের প্রদাহ (encephalitis)
৫. এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে

প্রতিরোধের উপায়
———————-
হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো টিকা গ্রহণ।

গুরুত্বপূর্ণ টিকা:
আমাদের দেশে সরকারিভাবে MR vaccine (Measles, Rubella) দেয়া হয়।
৯ মাস পূর্ণ হলে ১ম ডোজ
এবং ১৫ মাস পূর্ণ হলে ২ ডোজ।

এছাড়া MMR vaccine (Measles, Mumps, Rubella) ও পাওয়া যায়, এটা যে কোন বয়সে দেয়া যায়, ৪ সপ্তাহ গ্যাপ দিয়ে ২ টা ডোজ। কিন্তু গর্ভাবস্থায় এবং গর্ভধারণে ইচ্ছুক মহিলারা ৩ মাসের মধ্যে এটা নিতে পারবেন না।

✅সমসাময়ীক সময়ে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুরা হামে আক্রান্ত হচ্ছে এবং এদের মধ্যে জটিলতা ও মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। হামের বিরুদ্ধে আমাদের প্রচলিত টিকা কার্যক্রম শুরু হয় শিশুর ৯ মাস পূর্ণ হবার পর। সুতরাং এটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে, ৬ মাসের পর থেকেই এই টিকা কার্যক্রম শুরু করা যায় কিনা। কারণ ৬ মাস পর্যন্ত শিশু মাতৃদুগ্ধ থেকেই হাম প্রতিরোধক এন্টিবডি পায়, তাই ৬ মাস পর্যন্ত আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা একেবারেই কম।

চিকিৎসা
—————
হামের নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই, তবে উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা করা হয়।
১. পর্যাপ্ত বিশ্রাম
২. প্রচুর তরল খাবার
৩. জ্বর কমানোর ওষুধ
৪. ভিটামিন A সাপ্লিমেন্ট (বিশেষ করে শিশুদের জন্য
৫. পর্যাপ্ত প্রোটিন জাতীয় খাবার (মাছ, মাংশ, ডিম, দুধ)
👉 গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি প্রয়োজন হতে পারে।

সচেতনতা কেন জরুরি?
———————–
হাম শুধুমাত্র একটি সাধারণ জ্বর বা ফুসকুড়ি নয়—এটি জীবননাশের কারণও হতে পারে। তাই—
সময়মতো টিকা নেওয়া
আক্রান্ত ব্যক্তিকে আলাদা রাখা
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
এসব বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

হাম একটি প্রতিরোধযোগ্য কিন্তু বিপজ্জনক রোগ। সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ এবং সচেতনতা বাড়ানোই পারে এই রোগকে সম্পূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণে আনতে। নিজের ও পরিবারের সুরক্ষার জন্য টিকাদান নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব।

ফারহানা আফরোজ সীমা
সহযোগী অধ্যাপক, পেডিয়াট্রিক্স।

Comments (০)
Add Comment