হেলথ ইনফো ডেস্ক :
দেশের মেডিকেল কলজগুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা একটি ভোগান্তির অবসান ঘটেছে চলতি শিক্ষাবর্ষে, যা মেডিকেল শিক্ষায় পরিবর্তনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। এমবিবিএস ও বিডিএস ভর্তি শেষে মাইগ্রেশনে শিক্ষার্থীদের যে অতিরিক্ত আর্থিক চাপ বহন করতে হতো, তা এবার অভাবনীয় পর্যায়ে কমিয়ে এনেছে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর। সময়োপযোগী ও কার্যকর এই উদ্যোগে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এমবিবিএস ও বিডিএসে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর নানা কারণে অনেক শিক্ষার্থী ভর্তি বাতিল করে অন্যত্র চলে যায়। এতে প্রায় প্রতিটি মেডিকেল কলেজেই কিছু আসন ফাঁকা থেকে যায়। পরবর্তীতে এগুলো একাধিক ধাপে মাইগ্রেশনের মাধ্যমে পূরণ করে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর।
মূলত অধিক সুবিধাসম্পন্ন মেডিকেলগুলোর সব আসন পূরণের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হতো। কিন্তু প্রথমবার ফি পরিশোধ করে ভর্তি হওয়ার পরও মাইগ্রেশনে নতুন মেডিকেলে ভর্তিতে পূর্ণ টাকা দিতে হতো একজন শিক্ষার্থীকে।
বিদ্যমান বিধি অনুযায়ী, আগের মেডিকেল থেকে কাগজপত্র স্থানান্তর হওয়ার মতো ভর্তি ফিও পরের মেডিকেল কলেজে চলে যেতে পারতো। কিন্তু তা হচ্ছিল না। এতে প্রতি মাইগ্রেশনেই ফি দিতে গিয়ে হয় শিক্ষার্থীদের, যা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য।
বিষয়টি নিয়ে গত বছরের ২৬ জুলাই ‘মেডিকেল শিক্ষায় অযাচিত যত ফি’ শিরোনামে মেডিভয়েসে প্রকাশিত ভিডিও প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন জানিয়েছিলেন, দ্রুতই এর সমাধান হবে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, মেডিকেল শিক্ষার সংকট দূর এবং পড়াশোনার খরচ কমানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ চলমান রয়েছে।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের এই ঘোষণা এক বছরের ব্যবধানে তা বাস্তবে রূপ নিয়েছে। অবসান হয়েছে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা অনিয়মের। চলতি শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীরা নামমাত্র মূল্যে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন।
কক্সবাজার মেডিকেল কলেজে (কক্সমেক) মাইগ্রেশনে শিক্ষার্থীরা মাত্র ১১০০ টাকায় ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। এই স্বল্প টাকায় ভর্তি হতে পেরে শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা আনন্দিত। কর্তৃপক্ষের এমন উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করার পাশপাশি এমন মহৎ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন তারা।
ভর্তি হতে আসা শিক্ষার্থী হাম্মাদ জানান, ‘আমরা ভর্তি হওয়ার জন্য পূর্ণ ভর্তি ফি নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখানে এসে যখন জানতে পারি, ভর্তি ফি মাত্র ১১০০ টাকা। তখন খুবই খুশি হয়েছি। কক্সমেকের অসাধারণ এই পদক্ষেপে আমি আনন্দিত।’
ফয়সাল নামে আরেক শিক্ষার্থী জানান, ‘শুধু ১১০০ টাকায় ভর্তি হতে পারবো এটা কল্পনার বাইরে ছিল। এজন্য শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করছি। বাংলাদেশের অন্যান্য মেডিকেলসমূহে ও এই পদ্ধতি চালু করা উচিত।’
জানতে চাইলে কক্সবাজার মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সোহেল বকস মেডিভয়েসকে বলেন, ‘আমাদের ডিজি স্যারের সাথে বৈঠক হয়েছে। তিনি আমাদের মাইগ্রেশনকৃত শিক্ষার্থীদের ভর্তি ফি কম রাখার জন্য পরামর্শ দিয়েছেন। সে কারণে আমরা এবার যথাসম্ভব কম ফি রাখার চেষ্টা করেছি। আশা করছি, এতে শিক্ষার্থীদের উপকার হবে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ব্যয়ের খাতসমূহ যথাক্রমে বিশ্ববদ্যালয় রেজি.ফি ৩০০ টাকা, বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত ফি ৩০০ টাকা, ভর্তি ফি ২০০ টাকা, টিউশন ফি ৩০০ টাকা মিলিয়ে ১১০০ টাকা।
জামালপুর মেডিকেল কলেজে প্রথম মাইগ্রেশনে ভর্তিতে ২০০০ টাকা এবং অপেক্ষমাণ তালিকা থেকে ভর্তির ক্ষেত্রে ১২ হাজার ৯৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ২৬ জানুয়ারি কলেজ অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ স্বাক্ষরিত এক নোটিসে এ কথা জানানো হয়।
নির্দেশনা অনুসারে ২৮ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।
রাজধানীর মেডিকেল কলেজগুলোতেও ভর্তি ফি’র হার কমানো হয়েছে। মুগদা মেডিকেলের মাইগ্রেশনে শিক্ষার্থীরা দুই হাজার ছয়শ’ টাকা দিয়েছেন।
মেডিকেল শিক্ষায় দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও ভোগান্তির অবসান ঘটিয়ে মাইগ্রেশনে নামমাত্র ভর্তি ফি নির্ধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির বার্তা। এতে শুধু আর্থিক চাপ কমেনি, বরং স্বাস্থ্য শিক্ষা ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও মানবিকতার একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সময়োপযোগী এই উদ্যোগ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকলে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীরা মেডিকেল শিক্ষায় আরও উৎসাহিত হবে।
দেশের সব মেডিকেল কলেজে স্বচ্ছ নীতিমালার মাধ্যমে এই ব্যবস্থা স্থায়ী এখন রূপ পাবে বলে প্রত্যাশা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।