হেলথ ইনফো ডেস্ক :
বাংলাদেশে মাসিক এখনও একটি ট্যাবু হিসেবে রয়ে গেছে, যেখানে কুসংস্কার ও ভুল তথ্য দ্বারা আচ্ছাদিত। প্রতি মাসে ১৮০ কোটি মানুষ মাসিক অভিজ্ঞতা অর্জন করলেও, অনেক কন্যাশিশু প্রথম মাসিকের আগে এ বিষয়ে জানে না, ফলে তারা বিভ্রান্ত ও অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে। স্যানিটারি প্যাড কেনাও তাদের জন্য লজ্জাজনক হয়ে ওঠে, বিশেষত যখন পুরুষেরা দোকান চালায়। যার ফলে শিশুদের চলাফেরা, নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর গভীর প্রভাব পড়ে। মাসিক স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সঠিক তথ্যের প্রচার কিশোর-কিশোরীদের জন্য অত্যন্ত জরুরী।
বাংলাদেশে মাসিক স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য ইউনিসেফ সরকার, অংশীজন, স্কুল, পরিবার ও সমাজের সঙ্গে যৌথভাবে যে পাঁচটি উদ্যোগ গ্রহণ করেছে—
জরুরি পরিস্থিতিতে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার সমন্বয়
প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সংঘাতের সময়, যখন নারী ও কন্যাশিশুরা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে থাকে, মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। একাধিক আশ্রয়কেন্দ্রে স্যানিটারি প্যাডের অভাব, নেই কোনো শৌচাগার, পরিষ্কার পানি ও সাবানের দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি এবং গোপনীয়তা রক্ষা না হওয়ায় অনেক কন্যাশিশু অনিরাপদ বিকল্প ব্যবহারে বাধ্য হয়, ফলে তারা মারাত্বক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
এমন সংকটকালে ইউনিসেফ নারী ও কন্যাশিশুদের জন্য ‘ডিগনিটি কিট’ বিতরণ করে, যাতে স্যানিটারি প্যাড, সাবান, অন্তর্বাস, টর্চলাইট এবং হুইসেলসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী থাকে। এ ছাড়া, ইউনিসেফ মাসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সচেতনতামূলক সেশনও পরিচালনা করে, যাতে কন্যাশিশুরা কঠিন পরিবেশেও নিরাপদে মাসিক সামলাতে পারে।
কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে ইউনিসেফ কিশোরীদের পুনঃব্যবহারযোগ্য স্যানিটারি প্যাড তৈরির প্রশিক্ষণও দিয়ে থাকে, যা তাদের জরুরি স্বাস্থ্য প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি দক্ষতা ও আয় উপার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে।
সরকার ও অংশীজনদের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা (অ্যাডভোকেসি)
প্রতি বছর মাসিক স্বাস্থ্য দিবসে ইউনিসেফ সরকার, সুশীল সমাজ ও তরুণদের সঙ্গে যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে, যার মাধ্যমে মাসিক স্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্যবিধি ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমাজের নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করা হয়। এই উদ্যোগ কুসংস্কার দূর করতে, লজ্জা ও সামাজিক অবজ্ঞা কমাতে এবং কন্যাশিশুদের স্কুলে যাওয়া অব্যাহত রাখতে সহায়তা করে।
২০২১ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে মিলে জাতীয় মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কৌশল তৈরি করেছে, যার মূল লক্ষ্য কন্যাশিশু ও ছেলেদের স্কুলের পাঠ্যক্রমে মাসিক স্বাস্থ্য অন্তর্ভুক্ত করা এবং মাসিক স্বাস্থ্যবিধির পণ্যকে সকলের জন্য সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করা। এখন এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য সমাজ, সরকার ও বেসরকারি খাতকে একত্রে কাজ করার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
মাসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশে প্রায় ৩০ শতাংশ কন্যাশিশু মাসিকের কারণে গড়ে ২.৫ দিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ রাখে, যা মাসিক নিয়ে প্রচলিত সামাজিক লজ্জা এবং নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন স্থানের অভাবের কারণে হয়ে থাকে। এতে মেয়েরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হয় এবং তাদের বেড়ে ওঠা ও সাফল্য অর্জনের সুযোগ কমে যায়।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে ইউনিসেফ কাজ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন স্কুলগুলো জেন্ডার-সংবেদনশীল পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতা সুবিধায় বিনিয়োগ করে, কন্যাশিশুদের স্কুল অনুপস্থিতি ১৫ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া, ইউনিসেফ স্কুল ও স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রগুলোতে হাইজিন কর্নার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মডেল টয়লেট নির্মাণে কাজ করছে, যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্যও নিরাপদ মাসিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সহায়তায়, ইউনিসেফ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে স্যানিটারি প্যাড বিক্রয় মেশিন বসিয়েছে, যা ২৪/৭ স্যানিটারি ন্যাপকিনের সহজপ্রাপ্যতা নিশ্চিত করে।
এছাড়া, জাতীয় স্কুল পাঠ্যক্রমে মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি, শ্রেণিকক্ষে সক্রিয়ভাবে আলোচনা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে কন্যাশিশু ও ছেলেরা জানে যে মাসিক একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া এবং এতে লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।
তরুণ-তরুণীদের সঙ্গে এবং তাদের জন্য অনলাইনে আলোচনা
মাসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে ইউনিসেফ ইন্টারনেটের শক্তি কাজে লাগিয়ে ‘মাসিকবান্ধব’ অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করছে। এই প্ল্যাটফর্মে তরুণ-তরুণীরা নির্ভয়ে তাদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে পারে, প্রশ্ন করতে পারে এবং মাসিক সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে পারে।
অনলাইন আলোচনা বাংলাদেশের মতো দেশে, যেখানে মাসিক এখনও একটি ট্যাবু, একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। এটি তরুণদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য, সহবয়সীদের মাধ্যমে শেখার সুযোগ তৈরি করে এবং তাদের স্বাচ্ছন্দ্যে মাসিক বিষয়ে আলোচনা করার পরিবেশ তৈরি করছে।
ইন্টারনেট সুবিধার বিস্তার গ্রাম ও শহর উভয় এলাকাতেই তরুণ প্রজন্মকে সচেতন ও সহানুভূতিশীল করে তুলছে। এর মাধ্যমে একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে উঠছে যারা জানে, মাসিক একটি স্বাভাবিক বিষয় এবং তা লুকানোর কোনো প্রয়োজন নেই।
উৎসসমূহ
১. স্কুলগার্লস ইন বাংলাদেশ লার্ন দ্যাট পিরিয়ডস আর নাথিং টু বি অ্যাশেইমড অফ
২. হাউ টু সাপোর্ট ইওর ডটার উইথ হার ফার্স্ট পিরিয়ড
৩. ১০ ফাস্ট ফ্যাক্টস: মেনস্ট্রুয়াল হেলথ ইন স্কুলস
৪. আ স্টেপ বাই স্টেপ গাইড ফর টিচার্স টু টিচ গার্লস ইন ইওর ক্লাস অ্যাবাউট মেনস্ট্রুয়েশন
৫. ৭ অ্যালার্মিং মিথস অ্যাবাউট পিরিয়ডস উই হ্যাভ টু এন্ড নাও
৬. মোর রিসোর্সেস অন মেনস্ট্রুয়াল হাইজিন
সূত্র : মেডিভয়েস