বৃহত্তর স্বার্থে নবীন চিকিৎসকদের রাজনীতিতে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
শিক্ষার্থীদের ৮১ শতাংশ মনে করেন রাজনীতি শিক্ষা গ্রহণে ব্যাঘাত ঘটায়। তাই দেশের জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর স্বার্থে নবীন চিকিৎসকদের রাজনীতিতে না জড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
আজ রোববার (১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন হলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) রেসিডেন্সি প্রোগ্রামে ভর্তি হওয়া চিকিৎসকদের ইনডাকশন অনুষ্ঠানে এ পরামর্শ দেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ছাত্র-ছাত্রীদের ৮১ শতাংশ মনে করেন রাজনীতি শিক্ষা গ্রহণে ব্যাঘাত ঘটায়। শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অনুরোধ করবো তাদেরকে পলিটিক্সের চাপ বা ফ্লো দিবেন না। তাদেরকে আরও কীভাবে গবেষণায় মনোযোগ দেয়ার সুযোগ তৈরি করা যায়, তার ব্যবস্থা করবেন।

চিকিৎসা পেশায় জানার শেষ নেই উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বই পড়লেই হবে না, চিকিৎসা করতে করতে, রোগী দেখতে দেখতে শিখতে হবে। চিকিৎসকদের মানবিক হতে হবে। পাশাপাশি ভালো আচরণ ও হাসিখুশিভাবে রোগীদের সাথে কথা বলতে হবে।

দেশের অনেক রোগী বিদেশে চিকিৎসা নিতে যায়। এর পেছনে চিকিৎসার পাশাপাশি চিকিৎসকের আচরণের দায় আছে বলেও মন্তব্য করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন প্রধানমন্ত্রী পেয়েছি যিনি গাড়িতে পতাকা নেন না, সচিবালয়ে অফিস করেন, পায়ে হেঁটে অফিসে যান। মলিকুলার ল্যাব, ডাক্তারের বাসস্থানের বিষয়ে প্রস্তাব দেন, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেবো।

এ ছাড়াও বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬৬ একরের প্রকল্পের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে ভারতের বেঙ্গালুরুতে গিয়ে বিনা অপারেশনে নিজের সুস্থ হওয়ার গল্প শোনান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সাখাওয়াত হোসেন।

তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে ঘর থেকে বের হতে পারিনি, বাড়ির ভিতরে ছিলাম। পুলিশ ভিতরে ড্রিল ভেঙে প্রবেশ করে রাইফেল দিয়ে আমার ডান পায়ের উপর আঘাত করে, আমার ডান পায়ের টেন্ড্রুল ছিড়ে যায় এবং আমি মাটিতে পড়ে যাই, আর উঠতে পারলাম না।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের দিন থেকে আমার বন্ধু এবং অর্থপেডিক্সের চিকিৎসকরা গেলেন এবং সবার সিদ্ধান্ত অপারেশন করতে হবে। কীভাবে অপারেশন করতে সবকিছু দেখালেন। আর আমি প্রস্তুত হচ্ছিলাম এবং ইবনে সিনাতে ভর্তি হবো এবং পরে অপারেশন। এর মধ্যে আমার একজন বন্ধু বললেন, আমি তোমাকে ভারতের বেঙ্গালুরু নিয়ে যেতে চাই, আর আমি যেতে চাইনি। বললো, তুমি চলো, তোমার অপারেশন লাগবে না।

সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রীর অনুরোধে গেলাম। দেখলাম, নরমাল পোশাক পরে একজন চিকিৎসক বসে আছে। আমার পা দেখলেন, আমি চেয়ারে বসা এবং চিকিৎসার ফ্লোরে বসে আছে। চিকিৎসক নিজ হাতে আমার ডান পা দেখলেন এবং নড়াচড়া করলেন।

তিনি আরো বলেন, ‘ডাক্তার আমাকে বললেন, এমআরআই করবো এবং আমি বললাম, করান। আমি এমআরআই করলাম, আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টা পর রিপোর্ট নিয়ে আসলাম। দেখে বললেন, আপনার কোনো অপারেশন লাগবে না এবং বললেন, ওকে। আমি বললাম, কী ওকে? আমি দাঁড়াতে পারছি না। চিকিৎসক বললেন, আপনাকে আমি একটা জুতা দেই। চিকিৎসক কাকে যেন ফোন করলেন, জুতা চলে আসলো। জুতা পরে আমি হাঁটলাম এবং চিকিৎসক বললেন, ২১ দিন জুতা পরবেন। এ ছাড়া বললেন, ২১ দিন পরলেও আপনি দাঁড়াতে পারবেন না এবং সাত দিনের অনুশীলন দিলেন। সাত দিন জুতা ছাড়া অনুশীলন করলাম, কোনো অপারেশন লাগেনি।

সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘আমি কথাটা এই জন্য বললাম, যারা আমাকে অপারেশন করতে বলেছিল, তারা ভালো চিকিৎসক এবং অপারেশনের আগেও যে চিকিৎসা আছে, ওইটা হয়তো জ্ঞানে ছিল না।

চিকিৎসকদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে চিকিৎসকদের শিখতে হবে এবং শিখার ইচ্ছা থাকতে হবে। ডাক্তারি বিদ্যায় শিখার কোনো শেষ নাই এবং অনেক জানতে হয়। শিখায় কোনো ছাড় দেয়া যাবে না।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, এমপি, ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল। রেসিডেন্সি ইনডাকশন প্রোগ্রামে সভাপতিত্ব করেন ও নবাগত রেসিডেন্টদের শপথ বাক্য পাঠ করান ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। অনুষ্ঠানে মোট ১ হাজার ৩০৬ জন রেসিডেন্ট শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এর মধ্যে রয়েছে সার্জারি অনুষদে ৫৪৩ জন, মেডিসিন অনুষদে ৪০০ জন, শিশু অনুষদে ১২৪ জন, বেসিক সাইন্স ও প্যারাক্লিনিক্যাল সাইন্স অনুষদে ১৫৬ জন এবং ডেন্টাল অনুষদে ৮৩ জন।

ইনডাকশন প্রোগ্রাম সঞ্চালনা করেন বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম। রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম নিয়ে আলোকপাত করেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সম্মানিত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডা. শেখ ফরহাদ। এই পর্বে নিজ নিজ অনুষদের নবাগত রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রহীম সিদ্দিক, বেসিক সায়েন্স ও প্যারা ক্লিনিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, মেডিসিন অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. মো. শামীম আহমেদ, শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের কোর্স ডিরেক্টরগণ, অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষগণ, পরিচালকবৃন্দ, নবাগত রেসিডেন্টগণ বক্তব্য রাখেন। সবশেষে নবাগত রেসিডেন্টদের শপথ বাক্য পাঠ করান ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। অনুষ্ঠানে
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের জন্য মানসম্পন্ন চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চায়। সেই লক্ষ্য পুরণ করতে নবাগত রেসিডেন্টবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। সেজন্য রেসিডেন্টগণকে উচ্চতর মেডিকেল শিক্ষা জীবনের সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। চিকিৎসাসেবার জ্ঞানার্জনের সাথে সাথে গবেষণায়ও গুরুত্ব দিতে হবে। নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তুলতে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং রোবটিকসের ব্যবহারের বিষয়েও জ্ঞান থাকা জরুরি।

ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ তাঁর বক্তব্যে আজকের রেসিডেন্টগণ আগামী দিনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্তমান সরকারের স্বপ্ন যাত্রায় নেতৃত্ব দিবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল তাঁর বক্তব্যে মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রেসিডেন্টদেরকে সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, আজকের রেসিডেন্টরা আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিজেকে গড়ে তুলবেন সেটাই কাম্য। ই-লগ বুক ও ই-আইআরবি চালু, বিএমইউ জার্নাল, আইআরবি এবং ইভিডেন্স বেইসড মেডিসিনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনসহ বিএমইউতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে নবাগত রেসিডেন্টদের আন্তর্জাতিমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে তৈরি করার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। গত ১৫ বছরে বিএমইউতে তিন হাজার গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে গত ৫ বছরে ১১শ’ গবেষণার ফলাফল ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ইনডাকশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ তৈরি হবেন তাদের প্রধান কাজ দেশের জনগণের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখতে হবে। চিকিৎসাসেবা করাতে গিয়ে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ রোগীরা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। তাই কম খরচে কীভাবে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে করে রোগীদের চিকিৎসাব্যয় বর্তমান সময় থেকে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।

Comments (০)
Add Comment