জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. সজীব সরকারের মা এইচডিইউতে

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়া মেডিকেল কলেজের প্রভাষক ডা. সজীব সরকারের মা ঝর্ণা বেগম তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজধানীর উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন। একপর্যায়ে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

আজ শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) তাঁর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে বিকেলে তাঁকে উচ্চ নির্ভরশীলতা পরিচর্যা ইউনিটে (এইচডিইউ) স্থানান্তর করা হয়।

ডা. সজীবের বাবা হালিম সরকার বিষয়টি নিশ্চিত করে সন্ধ্যায় মেডিভয়েসকে বলেন, ‘গত দুই দিন আগে ২১ জানুয়ারি এভারকেয়ার হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ ঝর্ণা বেগমের তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে উত্তরার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি দুই দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। আজ তাঁর জ্ঞান ফিরে এসেছে। বিকেলে তাঁকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে এইচডিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে।’

জানা যায়, তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (ক্রনিক কিডনি ডিজিজ), ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধাজনিত সমস্যা (অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া) এবং ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ু ক্ষতি (ডায়াবেটিক পলিনিউরোপ্যাথি) রোগে আক্রান্ত। ডা. সজীবের মৃত্যুর পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।

আজমপুরে পুলিশের বর্বর আক্রমণে ডা. সজীব সরকারের শাহাদাত বরণ

এর আগে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই উত্তরার একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছোটভাই আব্দুল্লাহকে নিতে গ্রামের বাড়ি নরসিংদী থেকে ঢাকায় এসেছিলেন ডা. সজীব সরকার। সন্ধ্যা আনুমানিক ছয়টার দিকে আজমপুর এলাকায় পৌঁছান তিনি। এ সময় কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে পুলিশ। এক পর্যায়ে পুলিশ ডা. সজীব সরকারকে ঘিরে ফেলে। সেই সময় পুলিশের বর্বর আক্রমণে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র এক ফিট দূরত্ব থেকে করা একটি গুলি ডা. সজীব সরকারের হৃৎপিণ্ড ভেদ করে ডান দিকের স্কাপুলারের (কাঁধের হাড়) নিচে দিয়ে বের হয়ে যায়। তাঁকে বাঁচাতে জুলাই অভ্যুত্থানের ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধারা নিয়ে যান উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে নিভে গেছে প্রাণপ্রদীপ। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

শাহাদাতের অল্প কিছুক্ষণ আগে ছোটবোন সুমাইয়া সরকার স্বর্ণার সঙ্গে দেখা হয়েছিল সজীব সরকারের। ১৭ জুলাই ছিল তার জন্মদিন। স্বর্ণা ডা. সজীবকে জন্মদিনের শুভেচ্ছাও জানিয়েছিলেন। পরে শহীদ হওয়ার আগে চাচাতো ভাই ডা. অনিকুর রহমানকে পাঠিয়েছিলেন শেষ ক্ষুদেবার্তা। বলেছিলেন, পুলিশ খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। সবার কাছে দোয়াও চেয়েছিলেন তিনি।

শাহাদাতের বিবরণ দিয়ে ঐ বছরের ২৯ জুলাই শহীদ ডা. সজীব সরকারের চাচাতো ভাই ডা. অনিকুর রহমান মেডিভয়েসকে বলেন, ‘ভাইকে নিয়ে ফেরার পথে বিকেল পাঁচটা ৪৫ মিনিটের দিকে এক ক্ষুদেবার্তায় ডা. সজীব আমাকে জানান, পুলিশ তার কাছাকাছি রয়েছে। তাই নিরাপদে ফিরতে সবার দোয়া চান।’

‘সাথে সাথে আমি মুঠোফোনে কল এবং বার্তা পাঠাই। কিন্তু সাড়া পাওয়া যায়নি। তার ঠিক এক ঘণ্টা পরে একজন ফোন ধরে জানালো, ডা. সজীবের লাশ উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আছে এবং পুলিশের গুলিতে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা গেছে’—যোগ করেন ডা. অনিক।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রথমে ডা. সজীবকে পেটে লাথি দেওয়া হয়েছিল। আঘাতের তীব্রতা সইতে না পেরে বসে পড়েন তিনি। আর এই অবস্থায় এক ফিট দূরত্বের মধ্যে উপর থেকে তাকে গুলি করা হয়। উপর থেকে নিচ অ্যাঙ্গেলে একটা গুলি করা হয়। গুলিটা হার্টে লেগে ডান দিকের স্কাপুলার (কাঁধের হাড়) নিচে দিয়ে বের হয়ে যায়। উত্তরা আধুনিক মেডিকেলের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, ডা. সজিব গুলি খাওয়ার এক মিনিটের মধ্যে মারা গেছেন।’

পরে মেডিভয়েসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডা. সজীব সরকারের মা ঝর্ণা বেগম বলেন, ‘সকাল সাড়ে ১১টার দিকে আমার হাতে চার হাজার টাকা দিয়ে সে বিদায় নিয়েছে। বলেছে, মা টাকাটা রাখো, প্রয়োজনে খরচ করিও। যাওয়ার সময় কপালে একটা চুমু দিয়ে গেছে। তিনবার ডাক দিয়েছে, বলেছে—মা আমি যাই। আমি বলেছি, সাবধানে যেও। নিজের খেয়াল রেখো। আল্লাহ তোমার হেফাজত করবে।’

এরপর রাতে লাশ নরসিংদী পৌঁছার পর ডা জানতে পারেন সজীব সরকার আর নেই। দীর্ঘদিনের বাসস্থান নরসিংদী সদরের জেলখানা মোড় এলাকায় ডা. সজীবের জানাযার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু পুলিশের বাধায় জানাযা সম্ভব হয়নি। বাধ্য হয়ে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।
সূত্র : মেডিভয়েস

Comments (০)
Add Comment