চিকিৎসক হিসেবে বুঝি কতটা কঠিন পরিস্থিতিতে আপনারা কাজ করেন : স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী

হেলথ ইনফো ডেস্ক :

সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি উল্লেখ করে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত বলেন, ‘দেশের মানুষের জন্য অন্তত একটি মানসম্মত ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।’

আজ রোববার (১ মার্চ) সকাল সাড়ে ৯টায় রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন হলে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) রেসিডেন্সি প্রোগ্রামের চিকিৎসকদের ইনডাকশন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।

স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, এ কথাটি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। এটা ইউরোপ বা আমেরিকার কোনো দেশ নয়, যেখানে হয়তো প্রান্তিক গ্রাম থেকে তৃতীয় স্তরের (টারশিয়ারি) কেন্দ্র পর্যন্ত একই মানদণ্ড, একই পরিসংখ্যান, একই ধরনের মানুষ ও একই ধরনের ব্যবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে হয়। এটা অনেকাংশে তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়।

চিকিৎসকদের পেশাগত জটিলতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি আপনাদের প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা নিয়ে বুঝতে পারি যে অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের ডাক্তারদের কাজ করতে হয়। যেহেতু করতে হয় এবং হবে, যেহেতু আপনারা এই পেশায় নিজেদেরকে নিবেদিত করেছেন, যারা আজকের আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যুক্ত হচ্ছেন আমি মনে করি, আপনাদের সেই কর্মপরিবেশে কীভাবে কাজ করতে হবে, তা আমাদের জ্যেষ্ঠ (সিনিয়র) ডাক্তার এবং তত্ত্বাবধায়ক শিক্ষক (সুপারভাইজার টিচার) যারা থাকবেন, তাদের কাছ থেকে শেখার চেষ্টা করবেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি একদিকে যেমন ডাক্তার, অন্যদিকে রাজনীতিবিদ ও জনপ্রতিনিধি। আমরা সাধারণ মানুষের কাছে যাই, সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। তাই আমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ যে আমাদের ভোটার এই দেশের সাধারণ মানুষ, তাদের জন্য অন্তত একটি মানসম্মত ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা ও চিকিৎসা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।’

ড. মুহিত বলেন, ‘আমরা এসেছি, দায়িত্ব নিয়েছি মাত্র আট-নয় দিন হয়েছে, আমরা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়েছি। আমাদের একটি নির্বাচনী অঙ্গীকারপত্রে (ইশতেহার) দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য আমাদের লক্ষ্য ও দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। আমরা নির্ধারিত সময়ের জন্য এসেছি, কিছু কাজ করার উদ্দেশ্যে এসেছি। সেই কাজগুলো বাস্তবায়নের জন্য প্রতিটি চিকিৎসকের সহযোগিতা চাই। বিশেষ করে এখানে যারা জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক ও অনুষদ-প্রধানরা (ডিন) আছেন। তাঁরা আপনারা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার গভীর বিষয়গুলো সম্পর্কে অবগত। আপনাদের সহযোগিতা নিয়ে আমরা সারাদেশে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই।’

ড. মুহিত আরও বলেন, ‘আজকের এই আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে প্রায় ৩৫টি মেডিকেল কলেজ, ইনস্টিটিউট ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আপনারা যোগদান করেছেন। ৩৫টি হাসপাতালে আমরা যদি তৃতীয় স্তরের চিকিৎসাসেবা সর্বোচ্চ পর্যায়ে দিতে পারি, সব অনিয়ম দূর করতে পারি, আমাদের যে সীমাবদ্ধতাগুলো আছে, যেমন পরিবেশ, ডাক্তারদের নিরাপত্তা, ওষুধের সরবরাহ—এসব সমস্যা সমাধান করে মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে পারি, তাহলে শুধু এই ৩৫টি উৎকর্ষ কেন্দ্র (সেন্টার অব এক্সিলেন্স) থেকেই বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠী তৃতীয় স্তরের সেবা পেতে পারে।’

স্বাস্থ্যসেবা এগিয়ে নিতে চিকিৎসকদের সহযোগিতা চেয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা এখানে সহায়তাকারী ও প্রেরণাদায়ক অনুঘটক (ক্যাটালিস্ট) হিসেবে কাজ করতে এসেছি। আপনারা যে কোনো ভালো পরিকল্পনা নিয়ে এলে যা মানুষের কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর হবে, আমরা তা সর্বাত্মক সহযোগিতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বাস্তবায়নে কাজ করবো।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেব উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ, মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল। রেসিডেন্সি ইনডাকশন প্রোগ্রামে সভাপতিত্ব করেন ও নবাগত রেসিডেন্টদের শপথ বাক্য পাঠ করান ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। অনুষ্ঠানে মোট এক হাজার ৩০৬ জন রেসিডেন্ট শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নেন। এর মধ্যে রয়েছে সার্জারি অনুষদে ৫৪৩ জন, মেডিসিন অনুষদে ৪০০ জন, শিশু অনুষদে ১২৪ জন, বেসিক সাইন্স ও প্যারাক্লিনিক্যাল সাইন্স অনুষদে ১৫৬ জন এবং ডেন্টাল অনুষদে ৮৩ জন।

ইনডাকশন প্রোগ্রাম সঞ্চালনা করেন বিএমইউর রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম। রেসিডেন্সি প্রোগ্রাম নিয়ে আলোকপাত করেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কালাম আজাদ। স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (গবেষণা ও উন্নয়ন) অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন সম্মানিত কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার।

অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ডা. শেখ ফরহাদ। এই পর্বে নিজ নিজ অনুষদের নবাগত রেসিডেন্ট শিক্ষার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন সার্জারি অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. ইব্রহীম সিদ্দিক, বেসিক সায়েন্স ও প্যারা ক্লিনিক্যাল সায়েন্স অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী, মেডিসিন অনুষদের ডীন অধ্যাপক ডা. মো. শামীম আহমেদ, শিশু অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. মো. আতিয়ার রহমান, ডেন্টাল অনুষদের ডিন ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন।

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন অনুষদের কোর্স ডিরেক্টরগণ, অধিভুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষগণ, পরিচালকবৃন্দ, নবাগত রেসিডেন্টগণ বক্তব্য রাখেন। সবশেষে নবাগত রেসিডেন্টদের শপথ বাক্য পাঠ করান ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম। অনুষ্ঠানে

ডক্টরস এ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ তাঁর বক্তব্যে আজকের রেসিডেন্টগণ আগামী দিনের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় বর্তমান সরকারের স্বপ্ন যাত্রায় নেতৃত্ব দিবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

ড্যাবের মহাসচিব ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল তাঁর বক্তব্যে মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিশ্চিত করতে রেসিডেন্টদেরকে সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, আজকের রেসিডেন্টরা আগামী দিনের জ্ঞানভিত্তিক মানবিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নিজেকে গড়ে তুলবেন সেটাই কাম্য। ই-লগ বুক ও ই-আইআরবি চালু, বিএমইউ জার্নাল, আইআরবি এবং ইভিডেন্স বেইসড মেডিসিনে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জনসহ বিএমইউতে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়নের ফলে নবাগত রেসিডেন্টদের আন্তর্জাতিমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে নিজেকে তৈরি করার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। সেই সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। গত ১৫ বছরে বিএমইউতে তিন হাজার গবেষণা সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে গত ৫ বছরে ১১শ’ গবেষণার ফলাফল ইনডেক্স জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

তিনি বলেন, ইনডাকশন প্রোগ্রামের মাধ্যমে যে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগণ তৈরি হবেন তাদের প্রধান কাজ দেশের জনগণের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং গবেষণায় নেতৃত্ব দেওয়া। দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় রাখতে হবে। চিকিৎসাসেবা করাতে গিয়ে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ রোগীরা দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যায়। তাই কম খরচে কীভাবে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা যায় সেদিকে গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে করে রোগীদের চিকিৎসাব্যয় বর্তমান সময় থেকে অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব হয়।

Comments (০)
Add Comment