হেলথ ইনফো ডেস্ক :
মেহেরপুর ক্লিনিকে জরায়ুর টিউমার অপারেশনের আগে ‘মানসিক চাপ থেকে হার্ট অ্যাটাকে’ নাসিমা খাতুন (৬০) নামে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় ডা. মিজানুর রহমান ও ছেলে অবেদনবিদ ডা. অভিকে বেদম মারধর করেছে স্বজনরা। এই সময় দফায় দফায় ক্লিনিকে ভাঙচুর চালান তারা।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার দিকে ক্লিনিকের অপারেশন টেবিলে রোগীর মৃত্যুর পর চিকিৎসকদের ওপর হামলা করেন স্বজনরা। হামলায় গুরুতর আহত ডা. অভিকে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
জানা গেছে, গাংনী উপজেলার গাড়াবাড়ীয়া গ্রামের আব্দুল মজিদের স্ত্রী নাসিমা খাতুনের জরায়ুর টিউমার অপারেশন করার জন্য মেহেরপুর ক্লিনিকে নিয়ে আসেন ছেলে নাজমুল হুদা। রোববার বিকেলে তাকে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকের কথা মতো দুই ব্যাগ রক্ত সংগ্রহ করে দেয় এবং অগ্রিম ছয় হাজার টাকা প্রদান করে।
রাত ৮টার দিকে নাসিমা খাতুনকে অপারেশন থিয়েটারে (ওটি) নেন ক্লিনিকের স্টাফরা। সেখানে ছিলেন ডা. মিজানুর রহমান এবং অবেদনবিদ হিসেবে ছিলেন তার ছেলে ডা. অভি। কিছুক্ষণ পর অপারেশন টেবিলেই রোগী মারা যান।
এ ঘটনায় রোগীর স্বজনরা ক্ষুব্ধ হয়ে ডা. মিজানুর রহমান ও ডা. অভির ওপর হামলা চালায়। এতে ডা. অভি গুরুতর আহত হয়।
এ ব্যাপারে ডা. মিজান আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে মেডিভয়েসকে বলেন, ‘অপারেশনের জন্য আমরা ভেতরে নিয়েছিলাম। ওটি টেবিলে নেওয়ার পর প্যানিক অ্যাটাক থেকে হার্ট অ্যাটাক হয়ে মানসিক চাপ (কনভার্সন) শুরু হয়ে যায়। তখন রোগীকে সেইফ করার জন্য আমরা খুব চেষ্টা করেছি। অবেদনবিদ (অ্যানেসথেশিওলজিস্ট) হিসেবে ছিল আমার ছেলে, অস্ত্রোপচারে আমি ও অন্যান্য চিকিৎসকরাও ছিলাম। তখনও রোগীকে কোনো অপারেশন করা হয়নি, ওষুধও দেওয়া হয়নি। শুধু স্যালাইন চলছিল। এর মধ্যেই তিনি মারা যান। এরপর রোগীর স্বজনরা আমার ওপর হামলা চালায়। আমার ছেলে শরীর-স্বাস্থ্য ভালো হওয়ায় সে আমাকে সেভ করতে আসে। কিন্তু করতে পারেনি। ওর ওপর সবাই হামলে পড়ে। এক পর্যায়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। ভয়ানক সময়ে আমি পাশে না দাঁড়াতে পারলে মেরেই ফেলতো।’
পরে ছেলেকে উদ্ধার করে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিজের শারীরিক অবস্থা তুলে ধরে ভাঙা ভাঙা কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘একটু আগে সিটিস্ক্যান করে আসলাম। এখনো রিপোর্ট হাতে পাইনি। দেখি কী হয়? যদি অবস্থা খারাপ হয়, তাহলে আমাকে ঢাকা যেতে হবে। মাথায় খুব যন্ত্রণা করছে।’
এদিকে ডা. মিজানুর রহমান ৯৫ ভাগ সার্জারিতেই অ্যানেসথেশিওলজিস্ট নেন না বলে মেডিভয়েসের কাছে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় একজন চিকিৎসক। এতে তার মাধ্যমে মাঝে মাঝে এ রকম দুর্ঘটনা ঘটে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. মিজান বলেন, ‘ছোট খাটো কেস হলে আমরা করি। এ ছাড়া আমার ছেলে অ্যানেসথেশিওলজিস্ট। সে চলে আসার পর সে-ই করে। ও এনাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ থেকে অ্যানেসথেশিয়ার ওপর চৌদ্দ মাস প্রশিক্ষণ নিয়েছে। এ বিষয়ে উচ্চতর কোর্সে ভর্তির জন্যও চেষ্টায় আছে সে।’
সার্জন না হয়েও অস্ত্রোপচার করা নিয়ে নিজের ব্যাপারে অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. মিজান বলেন, ‘এর ওপর আমার প্রশিক্ষণ নেওয়া আছে। রংপুর মেডিকেল কলেজ থেকে জেনারেল সার্জারিতে আমি সার্টিফিক্যাট পেয়েছি। সে সময় ওই কোর্সের মেয়াদ ছিল ছয় মাস, সঙ্গে ছয় মাসের ইন্টার্নশিপ। মোট এক বছর।’
অন্যদিকে, মৃত্যুর খবর পেয়ে রোগীর লোকজন গ্রাম থেকে গিয়ে পুনরায় ক্লিনিকে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। তাৎক্ষণিক সেনাবাহিনীর একটি টিম গিয়ে বিক্ষুব্ধদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
নাসিমা খাতুনের ছেলে নাজমুল হুদা জানান, ‘আমার মার অকাল মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকের ফাঁসি হওয়া লাগবে। প্রয়োজনে ময়নাতদন্ত করবো।
মেহেরপুর সদর থানার ওসি হুমায়ুন কবির গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা লাশ উদ্ধার করে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়েছি। সেখানে চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানাবেন কি কারণে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। যদি চিকিৎসার অবহেলা বা ক্রটি পাওয়া যায় তবে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।