হেলথ ইনফো ডেস্ক :
সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের অগ্রাধিকার নির্ধারণের দাবি করেছেন একটি নীতিনির্ধারণী সংলাপের বক্তারা।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘প্রায়োরিটি হেলথ রিফর্ম অ্যাকশন এজেন্ডা : বাংলাদেশ রোড টু ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’ শীর্ষক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
ইউনিসেফ ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সহযোগিতায় সংলাপটি পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) ও ইউএইচসি ফোরামের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে রাজনৈতিক দল, একাডেমিয়া, সরকার, সুশীল সমাজ, উন্নয়ন সহযোগী ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন।
আলোচনার মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সৃষ্ট নীতিগত সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উদীয়মান সংস্কার সম্মতিকে বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপন্থায় রূপান্তর করা।
‘অ্যাডভান্সিং ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ : বাংলাদেশ হেলথ সেক্টর রিফর্ম রোডম্যাপ’ শীর্ষক ট্রিগার প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন ইউএইচসি ফোরামের সদস্য সচিব ডা. মো. আমিনুল হাসান।
উপস্থাপনায় আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণ হিসেবে থাইল্যান্ডের ইউনিভার্সাল কভারেজ স্কিমের কথা উল্লেখ করা হয়, যেখানে ধারাবাহিক রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ফলে ব্যক্তিগত পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।
পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) মহাসচিব ডা. জাহিরুল ইসলাম শাকিল বলেন, আমরা বারবার বলি স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছাবে কিন্তু বাস্তবে অনেক মানুষ এখনো উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়েও সেবা পাচ্ছেন না।
স্পষ্ট সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশনের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হয়নি।
ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে এম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, আমরা এখানে একে অপরের প্রতিপক্ষ নই। যে-ই ক্ষমতায় আসুক না কেন, পেশাজীবী হিসেবে আমাদের সবাইকে একে অপরকে সহায়তা ও গঠনমূলক সমালোচনার মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাত সংস্কারে এগিয়ে আসতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মান ও চিকিৎসা শিক্ষা প্রসঙ্গে বিএনপির পরিবার কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মহসিন জিল্লুর বলেন, ভুল চিকিৎসা এখন আমাদের দেশে ভয়াবহভাবে সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
সমস্যার উৎসস্থলে হস্তক্ষেপ করা জরুরি এবং এমন চিকিৎসক তৈরি করতে হবে যারা রোগীদের সঙ্গে অন্যায় করবেন না।
বাংলাদেশ পাবলিক হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ডা. সৈয়দ উমর বলেন, স্বাস্থ্য কেবল চিকিৎসামূলক বিষয় নয়। প্রতিরোধমূলক, উন্নয়নমূলক, চিকিৎসামূলক ও পুনর্বাসন– এই চারটি উপাদান পরস্পর সম্পর্কযুক্ত হলেও আমাদের ব্যবস্থা এখনো অতিমাত্রায় চিকিৎসা-কেন্দ্রিক।
বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে দলীয় রাজনীতি অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করেছে। যদি ধারাবাহিক সরকারগুলো প্রত্যেকে অন্তত একটি সূচকে উন্নতি করত, তাহলে আজ আমরা এ অবস্থায় থাকতাম না।
সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ও ইউএইচসি ফোরামের আহ্বায়ক হোসাইন জিল্লুর রহমান রোগীকেন্দ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন, যা কেবল চিকিৎসা নয়, প্রতিরোধ ও সামগ্রিক সুস্থতাকেও গুরুত্ব দেবে, বিশেষত নতুন সরকারের প্রেক্ষাপটে। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য ফলাফল কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নয়, বরং অর্থ, পরিকল্পনা ও প্রশাসনসহ অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের ওপরও নির্ভরশীল।
ইউনিয়ন পর্যায়ে বিশেষ করে মাতৃত্ব ও প্রসবসেবায় দুর্বলতার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপর্যয়কর স্বাস্থ্য ব্যয় যেকোনো পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার নিচে ঠেলে দিতে পারে, যা শুধু সুস্থতা নয়, উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও প্রভাবিত করে। অথচ স্বাস্থ্য এখনো রাজনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।
সংলাপটি স্বাস্থ্য সংস্কারকে জাতীয় নীতিগত অগ্রাধিকারে রাখার জন্য শক্তিশালী স্বাস্থ্য-অ্যাডভোকেসি, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও টেকসই রাজনৈতিক মনোযোগের আহ্বানের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়।