হেলথ ইনফো ডেস্ক :
তীব্র চিকিৎসক সংকটে দীর্ঘ দিন ধরে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনাকাঙিক্ষত এ অচলাবস্থা কাটাতে দ্রুততম সময়ে আয়োজন করা ৪৮তম বিশেষ বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নিয়োগ ও গেজেট প্রকাশ ঝুলে আছে। ফলে গ্রামে তীব্র চাহিদা সত্ত্বেও ৩৫০০-এর বেশি প্রস্তুত চিকিৎসক সেবায় যুক্ত হতে পারছেন না। এই অবস্থায় জুলাই আকাঙক্ষা পূরণের লক্ষ্যে নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতে দ্রুততম সময়ে গেজেট প্রকাশ ও পদায়নের দাবি জানিয়েছে ৪৮তম বিশেষ বিসিএস (স্বাস্থ্য) সুপারিশপ্রাপ্ত চিকিৎসক ফোরাম।
আজ সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন এ দাবি জানানো হয়।
৪৮তম বিসিএসে আয়োজন করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে এই বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত ডা. দেবাশীষ দাশ বলেন, ‘মাননীয় স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূর জাহান বেগম ম্যাডাম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান স্যার এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যারা অনুভব করতে পেরেছিলেন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ে চিকিৎসকের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে। যে কারণে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী তাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই সংকট দূর করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে একটি স্পেশাল বিসিএসের আয়োজন করা হয়।’
সাড়ে তিন মাসে বিসিএস সম্পন্ন, তিন মাসেও গেজেট নেই
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রাথমিক স্বাস্বাসেরা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অক্টোবরের মধ্যে ২০০০ এর অধিক চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়ার পরিকল্পনা করে। এই লক্ষ্যে গত ২৯ মে বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে ১৮ জুলাই এমসিকিউ ধরনের লিখিত, ১০ সেপ্টেম্বর এর মধ্যে ভাইভা পরীক্ষা নিয়ে ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করে। তবে এর পর তিন মাসের অধিক সময় অতিবাহিত হলেও গেজেট প্রকাশিত হয়নি।
চিকিৎসক সংকটের কারণে উপজেলায় স্বাস্থ্যসেবার বেহাল দশার একটি চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘গত ৩ জুলাই বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পটিয়া উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নেওয়ার জন্য বহির্বিভাগে অপেক্ষা করছিলেন শতাধিক রোগী। চিকিৎসকও মাত্র একজন। সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। রোগীরাও বিরক্ত, পটিয়ার পাঁচুরিয়া গ্রাম থেকে আসা ৯০ বছর বয়সী শ্বাসকষ্টের রোগী পুষ্প রানী বড়ুয়ার মেয়ে লতিকা বড়ুয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দেড় ঘণ্টার বেশি হয়েছে হাসপাতালে মাকে নিয়ে এসেছি। কিন্তু এখনো ডাক্তার দেখানোর সুযোগ পাচ্ছি না। যা আরও বেশি অসুস্থ হয়ে পাড়ছে। একইভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অন্য রোগীরা। এটা হল একটা উপজেলার চিত্র। বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলার প্রায় একই চিত্র দাঁড়িয়েছে।’
১২ হাজার ৯৮০ চিকিৎসকের পদ শূন্য
সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য খাত সংস্কার কমিশন ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানানো হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১২ হাজার ৯৮০টি চিকিৎসকের পদ শূন্য রয়েছে। যে কারণে তৃণমূলের স্বাস্থ্যসেবা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দেশের উপজেলা পর্যায়ে সরকারি হাসপাতালে তীর চিকিৎসক সংকট থাকা সত্ত্বেও ৩৫০০-এর বেশি প্রস্তুত চিকিৎসককে অলস বসিয়ে রাখা হয়েছে। এ সমস্যা নিরসনের উদ্দেশ্যে দ্রুততম সময়ে সুপারিশপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের নিয়োগ দেওয়ার বিশেষ প্রয়োজন।
এ সময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের উদ্ধৃতি চিকিৎসকরা বলেন, ৪৮তম বিসিএসের (বিশেষ) মাধ্যমে তিন হাজারের বেশি চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং তা আগামী নভেম্বরের মধ্যেই সম্পন্ন হওয়ার কথা। একই সঙ্গে বর্তমানে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা সম্পন্ন) অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান স্বাস্থ্য ক্যাডারে দ্রুত ও স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন এবং এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার তৃণমূল পর্যায়ের জনবল সংকট দূর করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন।
তবে বাস্তবে এই উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান অগ্রগতির মাধ্যমে প্রত্যাশিত আশার আলো দেখাতে পারেনি বলে জানান তারা।
কোর্স-বেসরকারি চাকরি ছেড়ে অনিশ্চয়তায় চিকিৎসকরা
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, সরকারি নিয়োগের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে চলার প্রেক্ষাপটে ৪৮তম বিসিএস (বিশেষ) পরীক্ষায় সাময়িকভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক চিকিৎসক তাদের চলমান উচ্চতর প্রশিক্ষণ, যেমন—এফসিপিএস বা এমডি-এমএস (কার্স) ছেড়ে দিয়েছেন। এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ ছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দ্রুত নিয়োগের আশ্বাস। কিন্তু তিন মাস গড়িয়ে গেলেও চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশ ও পদায়ন না হওয়ায় এই তরুণ চিকিৎসকরা এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। একদিকে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময় নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে উচ্চতর শিক্ষা থেকে বিরতি নেওয়ায় তাদের একাডেমিক ধারাবাহিকতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
চিকিৎসকরা বলেন, ‘কেউ কেউ কোর্স থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেছেন, কেউ কেউ ভাড়া বাসা ছেড়ে দিয়েছেন, কেউ কেউ বেসরকারি চাকরি ছেড়েছেন। এখন আমরা একটি অস্বস্তিকর পরিবেশ বা অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্যে আছি। এই মুহূর্তে আমাদের গেজেট প্রকাশিত হওয়াটা খুবই বেশি প্রয়োজনীয়।’
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন ৪৮তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত ডা. মো. রুহুল আমিন, ডা. মো. রিফাত খন্দকার, ডা. ইশরাত জাহানে ঈসা, ডা. আজাদ হোসেন ও রাতুল বালা বিশ্বাস।