অনুসন্ধানে দুদক : ঝালকাঠি হাসপাতালে ‘পিপলাই সিন্ডিকেট’

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
ঝালকাঠির ১০০ শয্যাবিশিষ্ট সদর হাসপাতাল। বাইরে ঝকঝকে সাইনবোর্ড, ‘রোগীর সেবা, জীবন রক্ষা’। দেয়ালজুড়ে নীতিবাক্যও চোখে পড়ে। কিন্তু ওষুধ কেনার টেন্ডারে চলছে ভিন্ন খেলা।

দরপত্রে একাধিক প্রতিষ্ঠানের নাম থাকলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এটি ছিল কাগজে-কলমে তৈরি করা সাজানো প্রতিযোগিতা। একই পরিবারের তিন প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়ে দাম নির্ধারণ করেছে নিজেদের মতো করে। এতে সরকারের ব্যয় বেড়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জনগণের ট্যাক্সের টাকা।
দুদক বলছে, হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. শামীম আহমেদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এই ‘পিপলাই সিন্ডিকেট’ই নিয়ন্ত্রণ করেছে টেন্ডারের পুরো প্রক্রিয়া।

এ ঘটনায় গতকাল বুধবার দুদক পিরোজপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ে মামলা করা হয়েছে। মামলায় তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. শামীম আহমেদের পাশাপাশি সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাইয়ের পরিবারের তিনজনকে আসামি করা হয়। মামলাটি তদন্তের জন্য দুদক প্রধান কার্যালয়ের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
এক ঠিকানায় তিন প্রতিষ্ঠান, একই পরিবারের সদস্য : জানা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে হাসপাতালের ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী ক্রয়ে পাঁচ কোটি টাকার বরাদ্দ ছিল।

এর মধ্যে ছয়টি গ্রুপে দুই কোটি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকার টেন্ডার আহবান করা হয়। বেসরকারি পর্যায়ের ওষুধ কম্পানির কাছ থেকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১৩৯ আইটেমের টেন্ডারে অংশ নেয় চার প্রতিষ্ঠান। এর তিনটির মালিক একই পরিবারের সদস্য। সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স পিপলাই এন্টারপ্রাইজ। সোহাগের মা শিপ্রা রানী পিপলাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স বাপ্পী ইন্টারন্যাশনাল এবং সোহাগের বাবা সত্যকৃষ্ণ পিপলাইয়ের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে মেসার্স আহসান ব্রাদার্স।

এই তিন প্রতিষ্ঠানের ঠিকানাও একই। আর সেটি হচ্ছে, উত্তর কাটপট্টি, পানির ট্যাংক লেন, বরিশাল।
দুদক বলছে, ৫১টি আইটেমে এসব প্রতিষ্ঠানের দেওয়া দর এমনভাবে কাছাকাছি ছিল যে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হওয়ার সুযোগই ছিল না।

একজন সুমনের হাতে পাঁচ প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ : সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই পরিবারের তিনটিসহ পাঁচটি দরপত্র জমা দেওয়া হয়। অন্য দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে পটুয়াখালী হাসপাতাল রোডের মেডিসিন ও সাধারণ ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলামের শহীদ ট্রেডার্স। অন্যটি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আতলপুরের মেসার্স ভাই ভাই ট্রেডার্স। পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে টেন্ডার দাখিলের জমাকৃত পে-অর্ডারের বিপরীতে নিরাপত্তা জামানতের (সিকিউরিটি) ফেরত চেক ছিল ২৪টি।

তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের ৬ জানুয়ারি ২৪টি চেক গ্রহণ করেছেন মাত্র একজন, মো. সুমন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাইয়ের অফিসকর্মী হচ্ছেন এই সুমন। অর্থাৎ কাগুজে প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা যতই হোক, নিয়ন্ত্রণ ছিল একই ব্যক্তির হাতে। টেন্ডারে একাধিক অংশগ্রহণকারী দেখালেও সিদ্ধান্ত ছিল একদল মানুষের হাতে।

মো. সুমন বলেন, ‘আমি অনেক বছর ধরেই সোহাগ দাদার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অফিসকর্মী হিসেবে কাজ করছি। দাদা (সোহাগ) তাঁর নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নয়, তাঁর মা-বাবার নামের প্রতিষ্ঠানগুলো দেখভাল করেন। আমিই তিনটি প্রতিষ্ঠানের সব কাগজপত্র সামলাই। ২৪টি চেক নেওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, দাদা চেকগুলো নিতে বলেছিলেন। তাই সেগুলো স্বাক্ষর দিয়ে গ্রহণ করেছি।’ সোহাগ কৃষ্ণ পিপলাই, তাঁর মা শিপ্রা রানী পিপলাই এবং বাবা সত্যকৃষ্ণ পিপলাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে সোহাগ বলছেন, ‘বিধি অনুযায়ী দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ পেয়েছি। যদি ভুল হয়ে থাকে, তা আমাদের নয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।’

প্রতিটি পাতায় ডা. শামীমের সিল-স্বাক্ষর : নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, দাখিল করা দরপত্র, টেন্ডার বই, এমনকি সিকিউরিটি ফেরত বই—সবখানেই তৎকালীন ডা. শামীম আহমেদের সিল ও স্বাক্ষর রয়েছে। দুদকের অভিযোগ, তিনি অনিয়ম সম্পর্কে জেনেও ব্যবস্থা নেননি, বরং প্রক্রিয়াটি অনুমোদন দিয়েছেন। রাজবাড়ীর পাংশায় মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুলের (ম্যাটস) অধ্যক্ষ হিসেবে ডা. শামীম আহমেদ কর্মরত। তিনি মুঠোফোনে বলেন, সরকারি ক্রয়নীতি অনুসরণ করে দরপত্র আহবান থেকে শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছিল। একই পরিবারের একাধিক ব্যক্তি যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজ পেতেই পারেন। মামলা হয়েছে বলে তিনি শুনেছেন।

দরে টেম্পারিংয়ের অভিযোগ : দুদকের তদন্তে দেখা গেছে, মেসার্স বাপ্পী ইন্টারন্যাশনালের দাখিল করা চত্রপব ঝপযবফঁষব-এর ৫১টি আইটেমের দর সংরক্ষিত প্রকৃত দরের সঙ্গে মিলছে না। কোথাও বাড়তি দাম, কোথাও পরিবর্তিত অঙ্ক। সরকারি নথিতে এটিকে বলা হয়েছে, দরপত্রের টেম্পারিং।

দুদকের দায়ের করা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, পিপিআর ১২৭(২)(খ) ধারায় বর্ণিত যোগসাজশমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭-এর ৫(২) এবং দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪২০ ও ১০৯ ধারায় মামলা হয়েছে। চক্রান্তমূলক দরপত্র, প্রতারণা ও ক্ষমতার অপব্যবহারের স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাই মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় শুধু হাসাপাতালের চিকিৎসক শামীম আহমেদ না, সোহাগ ও তাঁর মা-বাবাকেও আসামি করা হয়েছে।

এজাহারকারী পার্থ চন্দ্র পাল বলেন, ‘এক ঠিকানায় তিন প্রতিষ্ঠান, একই দরের প্রতিযোগিতা, দুর্নীতি ছাড়া এর অন্য ব্যাখ্যা নেই।
সূত্র : কালেরকন্ঠ

 

Comments (০)
Add Comment