Take a fresh look at your lifestyle.

অচল ৮ কোটি টাকার ক্যাথল্যাব, ফরিদপুরে হৃদরোগীদের হাহাকার

৬৭

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থাপিত কয়েক কোটি টাকার হৃদরোগ বিভাগের অত্যাধুনিক ক্যাথল্যাব দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে আছে। ফলে স্বল্প খরচে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলের কয়েক লাখ মানুষ।

২০১৬ সালে স্থাপন করা এই ক্যাথল্যাবটি আজও অজ্ঞাত কারণে চালু না হওয়ায় একদিকে যেমন নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে বাড়ছে রোগীদের ভোগান্তি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, প্রায় আট কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপন করা ক্যাথল্যাবটি চালু থাকলে এখানে এনজিওগ্রাম, এনজিওপ্লাস্টিসহ (রিং পরানো) হৃদরোগের গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কম খরচে দেওয়া সম্ভব হতো।

কিন্তু দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
রাজধানীমুখী রোগীর ঢল, বাড়ছে ঝুঁকি:

বর্তমানে ফরিদপুরে হৃদরোগের উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর ক্যাথল্যাব নেই। ফলে জরুরি অবস্থায় রোগীদের ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরে ছুটতে হচ্ছে। এতে যেমন সময় নষ্ট হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে মৃত্যুঝুঁকি।

চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের ক্ষেত্রে সময়ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত এনজিওগ্রাম ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে হৃদরোগ ও রক্তনালির রোগে প্রতিদিন প্রায় আনুমানিক ৫৬২ থেকে ৭৭৭ জন মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাদ্যে ভেজাল, অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন, ধূমপান ও মানসিক চাপ বৃদ্ধির কারণে হৃদরোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে।

এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ক্যাথল্যাব চালু থাকা অত্যন্ত জরুরি।
বেসরকারি নির্ভরতায় অসহায় নিম্ন আয়ের মানুষ:

ফরিদপুরে বর্তমানে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ক্যাথল্যাব সেবা থাকলেও সেখানে চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলক বেশি। ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর পক্ষে সেই সেবা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

স্থানীয়রা জানান, সরকারি হাসপাতালে ক্যাথল্যাব চালু হলে কম খরচে চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব হতো এবং অনেক জীবন রক্ষা পেত।

রোগীদের ক্ষোভ ও হতাশা:

হৃদরোগে আক্রান্ত ভুক্তভোগীরা বলছেন, সরকারি হাসপাতালে সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে বেশি খরচ করে বাইরে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

ফরিদপুর সদর উপজেলার বাসিন্দা আব্দুল করিম (৫৬) বলেন, আমার হার্টের সমস্যা ধরা পড়ার পর ডাক্তার এনজিওগ্রাম করতে বলেছেন। এখানে ব্যবস্থা না থাকায় ঢাকায় যেতে হয়েছে। যাতায়াত, পরীক্ষা আর চিকিৎসা মিলিয়ে প্রায় দুই লাখ ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। গরিব মানুষের জন্য এটা খুব কষ্টকর।

আরেক রোগীর স্বজন সাজেদা বেগম (৪২) বলেন, হঠাৎ বুকে ব্যথা উঠলে আমার বড় বোনকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু এখানে উন্নত কোনো ব্যবস্থা নেই। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়েছে। যদি এখানে ক্যাথল্যাব চালু থাকত, তাহলে হয়তো এত ঝামেলা পোহাতে হতো না।

সালথা উপজেলার বাসিন্দা মো. হান্নু মোল্যা বলেন, রাতে হার্টের সমস্যা হলে ঢাকায় নিতে নিতে অনেক সময় চলে যায়। এ সময়টাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। ফরিদপুরে ক্যাথল্যাব থাকলে অনেক রোগী বেঁচে যেত।

নগরকান্দা উপজেলার বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান বলেন, আমার বাবা গত বছর হার্ট অ্যাটাক করেছিলেন। তখন তাকে ফরিদপুরের মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। কিন্তু সেখানে হৃদরোগের চিকিৎসা না পেয়ে ফরিদপুরের বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাই, তার কয়েকদিন পরেই মারা যান আমার বাবা। আমার বাবা যদি তাৎক্ষণিক উন্নত চিকিৎসা পেত। তাহলে আমার বাবাকে বাঁচানো যেত।

স্থানীয় সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এত বড় একটি সরকারি প্রকল্প বছরের পর বছর অচল পড়ে থাকা দুঃখজনক। এতে একদিকে যেমন সরকারি অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে। তারা দ্রুত ক্যাথল্যাবটি চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

এহসানুল হক নামে একজন শিক্ষক বলেন, এটি শুধু একটি মেশিন নয়, এটি মানুষের জীবন বাঁচানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এটি অচল থাকা মানে মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে রাখা।

কী কারণে বন্ধ ক্যাথল্যাব?

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ক্যাথল্যাব চালুর জন্য প্রয়োজনীয় জনবল যেমন ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান থাকলেও মূল সমস্যা হচ্ছে যন্ত্রপাতি সচল না থাকা। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় মেশিনটি অনেকটাই অকেঁজো হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. মো. আজমল হোসেন বলেন, আমাদের প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান রয়েছে। কিন্তু ক্যাথল্যাবের মেশিনটি দীর্ঘদিন চালু না থাকায় অনেকটা অকেঁজো হয়ে গেছে। মেশিনটি ঠিক করা গেলে আমরা খুব দ্রুতই সেবা চালু করতে পারব।

হাসপাতালটির পরিচালক ডা. মো. হুমায়ূন কবির বলেন, ক্যাথল্যাবটি দীর্ঘদিন অচল রয়েছে। আমরা এটি সচল করার জন্য নিমিউকে (ন্যাশনাল ইলেকট্রো-মেডিকেল ইক্যুপমেন্ট মেইনটেইনেন্স ওয়ার্কশপ) চিঠি দিয়েছি। কিন্তু তারা জানিয়েছে, মেশিনটি ভালো নেই এবং তারা কাজ করতে পারবে না। তারা পরামর্শ দিয়েছে, যেখান থেকে মেশিনটি কেনা হয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ফিলিপস কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তবে এখন পর্যন্ত তারা কার্যকর কোনো সমাধান দেয়নি।

এ বিষয়ে ফিলিপস কোম্পানির তৎকালীন প্রতিনিধি মো. রফিক বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করলে আমরা মেশিন সারাতে চাহিদা পত্র দিয়েছিলাম, পরবর্তীতে আমাদের সঙ্গে আর কেউ যোগাযোগ করেনি।

স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে ভবিষ্যতে ক্ষতি আরও বাড়বে। কারণ দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকলে মেশিন সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, তখন নতুন করে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সেটি স্থাপন করতে হবে।

তারা মনে করছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানির মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত ক্যাথল্যাবটি সচল করা জরুরি।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ক্যাথল্যাব চালু হলে শুধু ফরিদপুর নয়, আশেপাশের জেলাগুলোর মানুষও উপকৃত হবে। এতে কম খরচে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত হবে এবং অনেক হৃদরোগীর জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

সূত্র : বাংলানিউজ২৪

Leave A Reply

Your email address will not be published.