Take a fresh look at your lifestyle.

মাদকাসক্তি শুরু কিশোর বয়সেই, গ্রামেও দ্রুত ছড়াচ্ছে: গবেষণা

দেশে মাদক ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র

১২২

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
দেশে মাদক ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র ও এর ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি উঠে এসেছে একটি গবেষণায়। আট বিভাগে ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে সংগৃহীত তথ্য নিয়ে করা এই গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এদের বড় একটি অংশ তরুণ, আর উল্লেখযোগ্য সংখ্যার মাদক গ্রহণ শুরু হয় ১৮ বছরের আগেই।

মাদক হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গাঁজা এবং উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণের প্রবণতাও। এমতাবস্থায় মাদক সমস্যাকে একটি বড় জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখার তাগিদ দিয়েছেন গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা।

আজ রোববার (২৫ জানুয়ারি) বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণসমূহ’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।

বিএমইউ ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালটেন্টস লিমিটেড (আরএমসিএল) যৌথভাবে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে গবেষণা কার্যক্রমটি সম্পন্ন করে। গবেষণাটি পরিচালিত হয় মানক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অর্থায়নে।

গবেষণার পরিধি

গবেষণায় দেশের আট বিভাগে ১৩ জেলা ও ২৬ উপজেলা থেকে পাঁচ হাজার ২৮০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এতে ল কোয়ান্টিটেটিভ ও কোয়ালিটেটিভ—উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে।

বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হার

গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বিভাগভেদে মাদক ব্যবহারের হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ময়মনসিংহ (৬.০২%), রংপুর (৬.০০%) ও চট্টগ্রাম (৫.৫০%) বিভাগে মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে রাজশাহী (২.৭২%) ও খুলনা (৪.০৮%) বিভাগে তুলনামূলকভাবে কম হার লক্ষ্য করা গেছে। সংখ্যার বিচারে সর্বাধিক মাদক ব্যবহারকারী বসবাস করছে ঢাকা বিভাগে (প্রায় ২২.৯ লাখ), এরপর রয়েছে চট্টগ্রাম (১৮.৮ লাখ) ও রংপুর বিভাগ (প্রায় ১০.৮ লাখ)।

বিভাগভিত্তিক মাদক ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা বরিশাল চার লাখ চার হাজার ১১৮ জন, চট্টগ্রাম ১৮ লাখ ৭৯ হাজার ৫০৩ জন, ঢাকা ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৭০ জন, খুলনা ৭ লাখ ২৬ হাজার ২১০ জন, ময়মনসিংহ ৭ লাখ ৬০ হাজার ৮১২ জন, রাজশাহী ৫ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৯ জন, রংপুর ১০ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৮ জন এবং সিলেট ৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪১ জন।

মাদক ব্যবহারের ধরন

মাদকের ধরন অনুযায়ী ব্যবহারকারীর আনুমানিক সংখ্যা হলো—গাঁজা (ক্যানাবিস) ৬,০৭৯,৯১৪ জন, মেথামফেটামিন (ইয়াবা) ২,২৯২,৭০৫ জন, অ্যালকোহল ২,০২০,৯৭৭ জন, কোডিন ফসফেট (কফ সিরাপ) ৩৩৯,৬৬০ জন, হেরোইন ৩২২,৬৭৭ জন, ঘুমের ওষুধ ৩০৫,৬৯৪ জন, ১৫২,৮৪৭ ইনহেল্যান্ট (যেমন: আঠা, পেইন্ট থিনার) এবং ৩৯,০৬১ ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণ করে। এ ছাড়া ১১,৮৮৮ ক্রিস্টাল মেথ (আইস), ৫,০৯৫ এলএসডি এবং ১৩,৫৮,৬৪ অন্যান্য মাদক ব্যবহার করে।

সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা

সমগ্র দেশে যে কোনো ধরনের মাদক ব্যবহারকারী ৮১ লাখ, ৯৪ হাজার ৬৫১ জন। মাদক প্রকারভেদ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রায় ৬১ লাখ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করে। এরপর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন (প্রায় ২৩ লাখ), অ্যালকোহল (২০ লাখ), কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ এবং হেরোইন।

গবেষণার প্রধান গবেষক বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হলো গাঁজা। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও কোডিনজাত কাশি সিরাপ। এ ছাড়া ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি।

ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকসেবী ৩৯ হাজার

ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। তবে এই ধরনের মাদক গ্রহণকারীদের এইচআইভি, হেপাটাইটিস ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। গবেষণায় জানানো হয়, একজন মাদক সেবনকারী মাসে কমবেশি ছয় হাজার টাকা ব্যয় করেন।

শহরে বেশি, বাড়ছে গ্রামেও

গবেষণার তথ্যে দেখা যায়, শহরাঞ্চলে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী রয়েছে ঢাকা বিভাগে, আর সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরের আশপাশের এলাকাগুলোতে মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।

কিশোর বয়সেই শুরু

একজন ব্যক্তি একাধিক ধরনের মাদক ব্যবহার করতে পারে জানিয়ে গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মাদক ব্যবহারকারীদের অধিকাংশই তরুণ বয়সের। প্রায় ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮-১৭ বছর বয়সে বা শিশু বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। ৫৯ শতাংশ ব্যবহারকারী ১৮-২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেছে। মাদক গ্রহণের প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বন্ধুদের প্রভাব, কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক চাপ।

মাদক সহজলভ্য!

গবেষণা প্রতিবেদনে বেকারত্ব, বন্ধুমহলের প্রভাব, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ ও অনানুষ্ঠানিক পেশায় যুক্ত থাকা মাদক ব্যবহারের প্রধান ঝুঁকিপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আশঙ্কাজনকভাবে, প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী মাদক সহজলভ্য বলে জানিয়েছে।

চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ঘাটতি

গবেষণায় বলা হয়, মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ কখনোই চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা নেয় না। আর যারা নেয়, তাদের অনেকেই প্রয়োজনীয় ও ধারাবাহিক সেবা পায় না। এর ফলে পুনরায় মাদক গ্রহণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।

জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখার তাগিদ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদক সমস্যা শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক পুনঃঅন্তর্ভুক্তির ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে কিশোর ও তরুণদের লক্ষ্য করে সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করার আহ্বান জানান তাঁরা।

গবেষকেরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফলাফল জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর মাদক নিয়ন্ত্রণ নীতি প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার জরুরি।

তিনি মাদকসক্তি নিয়ে গবেষণার উপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, এটা ভাবার কারণ নেই যে, কিছু সংখ্যক খারাপ মানুষ মাদকাসক্ত এবং আমরা বা আমাদের সন্তানেরা মাদক থেকে দূরে রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আমরা বা আমাদের সন্তানেরা মাদাকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যেই আছি। সবাইকে সচেতন হয়ে ঐক্যবদ্ধভাবেই এই ঝুঁকিকে মোকাবিলা করতে হবে।

মাদকের বিরুদ্ধে চাই সম্মিলিত লড়াই

বিশেষ অতিথি মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ বলেন, বর্তমান সময় ও বাস্তবতা হলো দেশের মানুষ মাদকাসক্ত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সামাজিক আন্দোলন, একটি সামাজিক যুদ্ধের মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে মাদক এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। মাদক নির্মূলে পরিবার থেকেই হোক প্রতিরোধ তা নিশ্চিত করতে হবে। মাদকাসক্তদের চিকিৎসাসেবা বিস্তারের লক্ষ্যে ঢাকা বাদে আরো সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যা করে সাতটি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র চালুর প্রকল্প বর্তমান সরকার পাস করেছে।

বিএমইউর কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার মাদক সরবরাহের উৎস ও চাহিদা কমানোর উপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, ‘শিশুরা-তরুণরা যারা জীবনটাকে বুঝতে পারার আগেই মাদকাসক্ত হচ্ছে অবশ্যই আমাদের সবাইকে মিলে এই শিশু ও তরুণ সমাজকে মাদক সেবনের ভয়াবহ ক্ষতি থেকে রক্ষা করতেই হবে।’

আরো উপস্থিত ছিলেন মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক মোহাম্মদ গোলাম আজম, কো-ইনভেসটিগেটর অধ্যাপক ড. মো. তাজুল ইসলাম, কো-ইনভেসটিগেটর ফোরকান হোসেন, বিএমইউর পরিচালক (হাসপাতাল) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইরতেকা রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক (সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল) ডা. মো. শাহিদুল হাসান বাবুল প্রমুখ।
সূত্র : মেডিভয়েস

Leave A Reply

Your email address will not be published.