হেল্থ ইনফো ডেস্ক :
বিশ্বজুড়ে ক্যানসার চিকিৎসায় উল্লেখযোগ্য বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হলেও কোটি কোটি মানুষের বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি। রোগ নির্ণয়ের পর এখনো অসংখ্য রোগীকে শারীরিক, মানসিক ও আর্থিকভাবে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।
ডব্লিউএইচওর হিসাব অনুযায়ী, প্রতি পাঁচজনের একজন জীবনের কোনো না কোনো সময় ক্যানসারে আক্রান্ত হবেন। এছাড়া নিজে আক্রান্ত হওয়া বা নিকটাত্মীয়ের মাধ্যমে বিশ্বের ৯২ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ক্যানসারের প্রভাবের মুখোমুখি হবেন।
ডব্লিউএইচওর ক্যানসার নিয়ন্ত্রণ বিভাগের প্রধান ডা. আন্দ্রে ইলবাউই বলেন, বহু বছর ধরে ক্যানসারের গল্প বলতে গিয়ে আমরা বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি, নতুন প্রযুক্তি, নতুন চিকিৎসা এবং নতুন আশার কথা শুনে আসছি। এসব সত্য এবং অবশ্যই বলার মতো বিষয়।
কিন্তু এটিই পুরো গল্প নয়।
চলতি বছরের ডব্লিউএইচওর বৈশ্বিক ক্যানসার পরিস্থিতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যানসার প্রতিরোধ, রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও পরিচর্যায় বৈষম্য এখনো অব্যাহত রয়েছে এবং তা আরও বাড়ছে।
বর্তমানে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হন এবং এক কোটি মানুষের মৃত্যু হয়। ২০৫০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা বেড়ে প্রায় সাড়ে তিন কোটিতে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ধনী দেশগুলোতে স্তন ক্যানসার বা শিশুদের ক্যানসারে আক্রান্তদের ৮৫ শতাংশ অন্তত পাঁচ বছর বেঁচে থাকেন। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলোতে এ হার ৩০ শতাংশেরও কম।
নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ডব্লিউএইচওর অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ২০টি ক্যানসার ওষুধের মধ্যে মাত্র ৯ থেকে ৫৪ শতাংশ পাওয়া যায়। বিপরীতে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এ হার ৬৮ থেকে ৯৪ শতাংশ। এছাড়া বিশ্বের ২৩টি দেশে রেডিওথেরাপির কোনো সুবিধাই নেই।
সাব-সাহারান আফ্রিকায় ক্যানসার শনাক্তের হার উন্নত অঞ্চলের তুলনায় কম হলেও সেখানে ক্যানসারে মৃত্যুর হার অস্বাভাবিকভাবে বেশি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ দেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার আওতায় ক্যানসার চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত নয়। চিকিৎসার উচ্চ ব্যয়ের কারণে কিছু দেশে ৯০ শতাংশ পর্যন্ত রোগী মাঝপথেই চিকিৎসা বন্ধ করতে বাধ্য হন।
রোগী ও তাদের পরিবারের ওপর পরিচালিত এক বৈশ্বিক জরিপে আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ এবং সেবাদানকারীদের ওপর অতিরিক্ত বোঝার চিত্র উঠে এসেছে।
নাইজেরিয়ার স্তন ক্যানসারজয়ী ও রোগী অধিকারকর্মী অ্যাবিগেইল সাইমন-হার্ট বলেন, ‘আমি এমন পরিবার দেখেছি, যেখানে বাবা-মাকে সন্তানের পড়াশোনার খরচ আর ক্যানসারের চিকিৎসার মধ্যে একটিকে বেছে নিতে হয়েছে। আবার অনেক শিশুকে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছে, কারণ পরিবারের সব অর্থ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, অনেক জায়গায় ক্যানসার নিয়ে সামাজিক কুসংস্কার এতটাই প্রবল যে তা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। তার ভাষায়, ‘আমি এমন অনেক নারীর সঙ্গে দেখা করেছি, যারা জীবন বাঁচানোর জন্য স্তন অপসারণ (মাস্টেকটমি) করানোর চেয়ে মৃত্যুকেই বেছে নিয়েছেন।’
তবে প্রতিবেদনে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জরায়ুমুখ ক্যানসার নির্মূলের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা, তামাক ব্যবহারের হার কমে আসা এবং অধিকাংশ দেশের জাতীয় ক্যানসার কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার (আইএআরসি) নজরদারি ইউনিটের উপপ্রধান ডা. ইসাবেল সোয়েরজোমাতারাম বলেন, ‘সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো, প্রতি ১০টি নতুন ক্যানসারের মধ্যে চারটিই এমন ঝুঁকিপূর্ণ কারণের সঙ্গে সম্পর্কিত, যেগুলো মোকাবিলা করার উপায় আমাদের জানা আছে। এর মধ্যে রয়েছে তামাক ব্যবহার, বিভিন্ন সংক্রমণ, অ্যালকোহল সেবন এবং অতিরিক্ত ওজন।’
ডব্লিউএইচওর বিশেষজ্ঞরা বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, চিকিৎসার মতো পরিচর্যাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একই সঙ্গে তারা সরকারগুলোকে ক্যানসার প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও রোগী পরিচর্যায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের আহ্বান জানিয়েছেন।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


