Take a fresh look at your lifestyle.

শিশুকে মুঠোফোন ও টিভি দিচ্ছেন? জানুন নিরাপদ উপায়

৭৩

ডা. হাবিবুর রহমান ভূঁইয়া:
দুই বছর বয়সের আগে শিশুকে কোনোভাবেই স্ক্রিন দেয়া যাবে না। দুই থেকে তিন বছর বয়সে খুবই সীমিত সময়ের জন্য মোবাইল বা টিভি দেয়া যেতে পারে। শিশুর এই বয়সে তার মস্তিষ্ক প্রতি সেকেন্ডে অসংখ্য স্নায়ুবন্ধ (সিন্যাপস) তৈরি করছে। এই সময় বাস্তব পৃথিবী তাকে সবচেয়ে বেশি শেখায়—রং, শব্দ, গন্ধ, মানুষের মুখ, প্রকৃতি, খেলা। কিন্তু ডিজিটাল স্ক্রিনের জগৎ এই বাস্তব অভিজ্ঞতাকে ধীরে ধীরে ঢেকে দিতে পারে। আমাদের ব্যস্ততার কারণে না চাইলেও আমরা অনেক সময় শিশুকে ফোন দিতে বাধ্য হই। স্ক্রিন পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে যেমন শিশু ক্ষুব্ধ হয়, তেমনি নিয়ন্ত্রণহীন স্ক্রিন তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। এই দুইয়ের মাঝে সঠিক ভারসাম্যই হলো নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার।

প্রথমত, অভিভাবকদের নিজেরাই ঠিক করে নিতে হবে প্রতিদিন কত মিনিট শিশুকে স্ক্রিন দেওয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা দিনে সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা স্ক্রিন টাইম সুপারিশ করেন। এই এক ঘণ্টাও এক সাথে নয়—২০ বা ৩০ মিনিটের ছোট সেশন ভালো। এতে শিশুর মনোযোগ ধরে রাখতে সুবিধা হয় এবং চোখের চাপও কম পড়ে।

কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

ফোন বা টিভি দেওয়ার সময় সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, কন্টেন্ট নিয়ন্ত্রণ করা। সব ভিডিও শিশুর জন্য নিরাপদ নয়, বিশেষত ইউটিউবে সাধারণ ভিডিও চালালে মাঝখানে অনুপযুক্ত কন্টেন্ট ঢুকে যেতে পারে।
তাই শিশুর বয়স অনুযায়ী অ্যাপ ব্যবহার, যেমন—YouTube Kids, ফোনের Parental Control (ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ ও ফিল্টারিং ব্যবস্থা)—এগুলো নিশ্চিত করে রাখুন। শিশু যেন কখনোই সাধারণ ইউটিউব, বা অটোম্যাটিক সাজেশন মোডে ঢুকে না যেতে পারে। তাই আগে ডাউনলোড করে গাইডেড প্লেলিস্ট ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ।

সময় নির্বাচন

শিশুর স্ক্রিন ব্যবহারে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সময় নির্বাচন। খাবার সময়, পড়ার সময়, ঘুমানোর ঠিক আগে কোনোভাবেই স্ক্রিন দেওয়া যাবে না। খাবারের সময় ফোন দিলে শিশুর মনোযোগ নষ্ট হয়, খাবার চিবানোর গতি কমে এবং পরবর্তী সময়ে সে স্ক্রিন ছাড়া খাবার মুখে তুলতেই চায় না। আর ঘুমের আগে স্ক্রিন দিলে ঘুমের হরমোন মেলাটোনিন কমে গিয়ে শিশুর ঘুম ব্যাহত হয়, যা পরের দিনের আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

যখন শিশুকে ফোন বা টিভি দেবেন, তাকে নিছক দর্শক বানিয়ে রাখবেন না। পাশে বসে কথা বলুন, প্রশ্ন করুন, ব্যাখ্যা দিন। যেমন—
‘ওই পাখিটা দেখেছো? কী সুন্দর উড়ছে!’
‘এই ছেলেটা কীভাবে সমস্যার সমাধান করছে দেখো।’

এতে স্ক্রিন সময় শুধু বিনোদন নয়, বরং শেখার অভিজ্ঞতায় পরিণত হয়। পাশাপাশি শিশুকে শেখানো যায়, স্ক্রিন হলো জীবনের একটি অংশ, কিন্তু পুরো জীবন নয়।

স্ক্রিনের বিকল্পগুলো থাকুক সমান রঙিন

স্ক্রিন যাতে করে শিশুর কাছে আকর্ষণের কেন্দ্র না হয়ে ওঠে, তার জন্য বাস্তব জীবনের বিকল্পগুলোকেও সমান রঙিন করতে হবে। রংপেন্সিল, পাজল, ব্লক, গল্পের বই, খেলা—এসব শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে অনেক বেশি সহায়তা করে।

যদি শিশুর দিনের বেশিরভাগ সময় খেলনা, গল্প বা আঁকায় ভরে থাকে, তাহলে সে স্বাভাবিকভাবেই স্ক্রিন কম চাইবে।

শিশুর শারীরিক নিরাপত্তায় নজর দিন

ফোন বা টিভি ব্যবহার করার সময় শারীরিক নিরাপত্তা গুরুত্বপূর্ণ। টিভি অবশ্যই দেয়ালে ঝুলানো থাকতে হবে। শিশুকে ফোন হাতে দিয়ে ঘুরতে দেয়া উচিত নয়; বসে দেখবে, চোখ থেকে অন্তত এক হাত দূরে রেখে। অতিরিক্ত আলো, উজ্জ্বলতা বা শব্দ শিশুর চোখ-মস্তিষ্কে বাড়তি চাপ ফেলে। তাই স্ক্রিনের মাঝারি ব্রাইটনেস ও কম ভলিউম ব্যবহার করুন।

একেবারে ছোট একটি নিয়ম খুব কার্যকর, তাহলো—‘স্ক্রিন, এরপর ৫ মিনিট বাস্তব খেলা।’ অর্থাৎ স্ক্রিন বন্ধ হওয়ার পর শিশুকে হালকা খেলায় ব্যস্ত করে দিলে স্ক্রিনের ওপর নির্ভরতা কমে যায়।

স্ক্রিন ব্যবহারে শিশুর আদর্শ বাবা-মা

বাবা-মায়ের নিজের স্ক্রিন ব্যবহারের ধরন শিশুর আচরণে সরাসরি প্রভাব ফেলে। আপনি যদি সবসময় ফোন হাতে রাখেন, তবে শিশু আপনাকে দেখেই শিখবে। তাই শিশুর সামনে ফোন ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে দিন। এতে শিশুর নিয়ন্ত্রিত অভ্যাস আরও সহজে তৈরি হয়।

নবজাতক শিশু বিশেষজ্ঞ
সূত্র : মেডিভয়েস

Leave A Reply

Your email address will not be published.