হেলথ ইনফো ডেস্ক :
প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য জোরদার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং টেকসই অর্থায়নে সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, বরং কার্যকর বাস্তবায়নের রূপরেখাই এখন সময়ের দাবি। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবের সমন্বয়ে জনমুখী ও সহজলভ্য একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তারা।
আজ মঙ্গলবার (৩ মার্চ) রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপ মিলনায়তনে ‘স্বাস্থ্যখাত সংক্রান্ত ইশতেহার বাস্তবায়ন: অংশীজন সংলাপ ও অগ্রাধিকার রূপরেখা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এই আহ্বান জানান তারা।
যৌথভাবে এর আয়োজন করে অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশ, ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ড. শাফিউন এন. শিমুল বলেন, সরকারের ইশতেহারে অন্যান্য বিষয়ের মতো স্বাস্থ্যখাতকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেখানে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা, ডাক্তারসহ সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ বেগবান করা এবং জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে অবকাঠামো উন্নয়নসহ জবাবদিহিতা নিশ্চিতে জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রোগ প্রতিরোধেও দেওয়া হয়েছে যথেষ্ট গুরুত্ব।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিশ্রুতি অনেক। যেই স্বপ্ন দেখানো হয়েছে, তা আমরা কীভাবে বাস্তবায়ন করবো? আজকের আলোচনায় সেদিকেই আলোকপাত করা হবে। যদি মোটা দাগে বলি, তাহলে তিনটি জায়গায় অগ্রাধিকার পেতে পারে। এক. প্রাথমিক ও প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার শক্ত ভিত্তি তৈরি করা। অর্থনৈতিক সক্ষমতায় আমাদের সমপর্যায়ের দেশ শ্রীলঙ্কার দিকে দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, তারা স্বাস্থ্যের এই দুটিতে ভালো করেছেন। খ. ইশতেহারে সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারের বিষয়গুলো নিয়ে যে আমরা আলোচনা বারবার করি—তাহলো আমাদের স্বাস্থ্যে বরাদ্দ কম। আবার যে বাজেট দেওয়া হয়, সেটাও ঠিক মতো ব্যয় হয় না। আবার যা ব্যয় হয়, তাও ঠিক মতো হয় না, সেখানে অনেক দুর্নীতির খবর পাওয়া যায়। গ. আমাদের অনেক বড় স্বপ্ন—আমরা ইউনিভার্সাল হেলথ কাভারেজে সাফল্য অর্জন করতে চাই, তাহলে আমাদের অর্থ কোত্থেকে আসবে? এজন্য ইনোভেটিভ ফিন্যান্সের বিকল্প নেই।
অনুষ্ঠানে ‘কাঠামো থেকে সেবা: বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবতা’ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের কনভেনর ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ।
তিনি বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সংজ্ঞা অনুযায়ী একজন স্বাস্থ্যবান মানুষ হবেন পরিপূর্ণ মানুষ। তিনি কারও সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে পারেন না, একই সঙ্গে তিনি অনুৎপাদনশীল ও নীতিভ্রষ্টও হবেন না। এর সঙ্গে আমাদের জীবন ধারা, আমাদের পরিবেশ, শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয়, অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবাও জড়িত। এখানে যে কয়টা বিষয় গুরুত্বপূর্ণ তার মধ্যে স্বাস্থ্য মাত্র একটি বিষয়। আমরা যখন স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা করি, তখন শুধু ওই একটি বিভাগ নিয়েই আলোচনা করি, তাহলো—স্বাস্থ্যসেবা। অথচ এই স্বাস্থ্যসেবার ভেতরেও যে প্রমোটিভ, প্রিভেনটিভ, কেউরেটিভ, রিহ্যাবিলিটেটিভসহ নানা বিষয় জড়িত। কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে যখন আলোচনা করি, তখন আমরা শুধু ওই একটাতেই অর্থাৎ কেউরেটিভেই সীমাবদ্ধ থাকি। এজন্য স্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে উঠে না। স্বাস্থ্যের সমস্যা কার্যকরভাবে দূর হয় না।’
অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সংস্কার সমন্বয় বিষয়ে আলোচনা করেন বিএমইউর ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান এবং অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস বাংলাদেশের জয়েন্ট কনভেনর অধ্যাপক ড. সৈয়দ মো. আকরাম হোসেন।
তিনি বলেন, ‘দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো স্বাস্থ্যখাত সংস্কার বিষয়ক কমিশন হয়েছে, যা ব্রিটিশ আমলে একবার হয়েছিল। এর মধ্যে আর হয়নি। এর সুবাদ একটি বিষয়ের নানা দিক নিয়ে আলোচনা, চর্চা হয়েছে। এখানে রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি অন্যান্য পেশাজীবীরাও অংশ নিয়েছেন। এটা আমাদের একটি বড় প্রাপ্তি। এই আলোচনার কল্যাণে আমরা ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যখাত নিয়ে কী করবো, তা নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ হয়েছে। এটা সহজ হয়েছে। এ রকম একটি ডকুমেন্ট আমরা পেয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন অধ্যাপক ডা. ইউনূসের কাছে এই ডকুমেন্টটি শেয়ার করি, তখন তিনি একটি কথা বলেছিলেন যে, এটা এই সময়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হবে কি হবে না, তার থেকে বড় কথা হলো—এটা একটি রেফারেন্স ডকুমেন্ট হিসেবে ভবিষ্যতে কাজে লাগানো যাবে।’
এ সময় স্বাস্থ্য নিয়ে বিএনপির ইশতেহারে উল্লেখিত কিছু বিষয় তুলে ধরে ড. আকরাম বলেন, সেখানে স্বাস্থ্যে জিডিপির ৫ ভাগ বরাদ্দ, ই-হেলথ কার্ড, বিনামূল্যে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা বিধানের কথা ছিল। পাশাপাশি প্রতি জেলায় আধুনিক সেকেন্ডার স্বাস্থ্যসেবা ইউনিট, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, রোগ প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য সচেতনতা, মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা, প্রাণঘাতী রোগের চিকিৎসাসহ অনেকগুলো বিষয়গু বিএনপির ইশতেহারে গুরুত্বের সঙ্গে জায়গা পেয়েছে।
অন্যদিক স্বাস্থ্যখাত সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবনায় ছিল জনমুখী, সহজলভ্য ও স্বার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। এই তিনটি বিষয়টি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এগুলো বিএনপির ইশতেহারের পরিপূরক বলা চলে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সেক্রেটারি অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল ও ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক ড. এ. কে. আজাদ খান।
সঞ্চালনা করেন ঢাবি স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সুজানা করিম।