Take a fresh look at your lifestyle.

মেলিওয়েডোসিস সংক্রামক ব্যাধিতে মৃত্যুহার কমাতে রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি

৮৮

হেলথ ইনফো ডেস্ক :
দেশে তুলনামূলকভাবে অজ্ঞাত হলেও মারাত্মক সংক্রামক রোগ মেলিওয়েডোসিস ধীরে ধীরে উদ্বেগজনক জনস্বাস্থ্য সমস্যায় পরিণত হচ্ছে। সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা জটিল অবস্থায় চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, যার ফলে মৃত্যুঝুঁকিও বেড়ে যায়।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি), বারডেম জেনারেল হাসপাতাল এবং ডায়াবেটিক অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের যৌথ ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত একটি বৈজ্ঞানিক সেমিনারে অংশ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা এ সতর্কবার্তা দেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি), মডরা, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও ওয়েলকাম ট্রাস্টের অর্থায়নে অনুষ্ঠিত এই সেমিনারে দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, চিকিৎসক এবং গবেষকেরা অংশ নেন।

সেমিনারে জানানো হয়, ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে মেলিওয়েডোসিস শনাক্ত ও নজরদারি জোরদার করতে আইসিডিডিআর,বি এবং বারডেম জেনারেল হাসপাতালের যৌথ উদ্যোগে একটি গবেষণা প্রকল্প চলমান রয়েছে। সিডিসি এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে।

সেমিনারে বাংলাদেশে মেলিওয়েডোসিসের পরিবেশগত উৎস, হাসপাতাল-সম্পর্কিত সংক্রমণের ঝুঁকি, ডায়াবেটিস রোগীদের মধ্যে রোগের পুনরাবৃত্তি এবং মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির কারণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। বক্তারা ‘ওয়ান হেলথ’ সমন্বিত স্বাস্থ্য দৃষ্টিভঙ্গির ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেন, ‘পরিবেশ, মানুষ ও রোগ—এই তিনটির পারস্পরিক সম্পর্ক বুঝে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করাই মেলিওয়েডোসিস নিয়ন্ত্রণের মূল চাবিকাঠি।’

বিশেষজ্ঞ প্যানেল আলোচনায় উপস্থিত সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ও মাইক্রোবায়োলজিস্টরা একমত পোষণ করেন যে, মেলিওয়েডোসিসে মৃত্যুহার কমাতে হলে চিকিৎসকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি, ল্যাব সুবিধা উন্নতকরণ, সময়োপযোগী রোগ নির্ণয় এবং কার্যকর জাতীয় নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

তাঁদের মতে, মেলিওয়েডোসিস বর্তমানে বাংলাদেশে একটি ‘নীরব ঘাতক’ হিসেবে বিদ্যমান। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ না নেওয়া হলে ভবিষ্যতে এই রোগ আরও বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

মেলিওয়েডোসিস রোগের একটি ঘটনা তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলেন, সম্প্রতি কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল ভ্রমণের পর ঢাকার বাসিন্দা মো. রাসেল রায়হান ও তাঁর দুই বন্ধু জ্বরে আক্রান্ত হন। কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁর বন্ধুরা সুস্থ হয়ে উঠলেও রাসেল রায়হানের শারীরিক অবস্থার ক্রমাগত অবনতি হতে থাকে। পরবর্তী চার মাসে তাঁকে একাধিকবার হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়, এমনকি নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রেও (আইসিইউ) চিকিৎসা নিতে হয়। এ সময়ে তাঁকে টাইফয়েড ও নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসা দেওয়া হলেও প্রকৃত রোগ শনাক্ত না হওয়ায় তাঁর অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি। এক পর্যায়ে পরিবার চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার আশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলে।

এক পর্যায়ে রাজধানীর বারডেম জেনারেল হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তাঁর প্রকৃত রোগ শনাক্ত হয়—মেলিওয়েডোসিস। জানা যায়, রোগী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ছিলেন, যা মেলিওয়েডোসিসের একটি বড় ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মেলিওয়েডোসিস রোগটির কারণ ব্যাকটেরিয়া বারখোলডেরিয়া সুডোম্যালেই, যা মূলত মাটি ও পানিতে বসবাস করে। ত্বকের ক্ষত দিয়ে সংক্রমণ, দূষিত পানি বা খাবার গ্রহণ এবং ধুলাবালির মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে প্রবেশ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারী বৃষ্টি ও বন্যার পর সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। রোগটির উপসর্গ অত্যন্ত বৈচিত্র্যময় হওয়ায় এটি প্রায়ই নিউমোনিয়া, যক্ষ্মা বা রক্ত সংক্রমণের মতো অন্যান্য রোগের সঙ্গে মিলিয়ে ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করা হয়।

তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ মেলিওয়েডোসিসের একটি নিশ্চিত দেশ (ডেফিনিটিভ কান্ট্রি)। ১৯৬৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে অন্তত ১৫০টি মানবদেহে মেলিওয়েডোসিসের ঘটনা শনাক্ত হয়েছে এবং দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি পরীক্ষার মাধ্যমে বি. সুডোম্যালেই ব্যাকটেরিয়াও আলাদা করা সম্ভব হয়েছে। তবে উন্নত মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবের অভাব, সীমিত নজরদারি ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের মধ্যে সচেতনতার ঘাটতির কারণে রোগটি এখনও ব্যাপকভাবে আন্ডারডায়াগনোসড ও আন্ডাররিপোর্টেড রয়ে গেছে।

Leave A Reply

Your email address will not be published.