Take a fresh look at your lifestyle.

ফ্যাসিস্টের দোসর ও সিন্ডিকেটে শিক্ষক সংকট মেডিকেল কলেজে

আবুল হাসনাত আবদুল্লাহর ইসারায় চলতো শের-ই বাংলা মেডিকেল ও কলেজ

138

শাহিন সুমন :
বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল ও কলেজে রাজনৈতিক প্রভাব সর্বদাই অগ্রাধিকার পেয়ে আসছে। উচ্চ পদস্থ কিংবা ভালো মানের চিকিৎসক বরিশালে এসেও অদৃশ্য সেন্ডিকেটের কারনে তাদের পদায়ন কিংবা এখানে চাকুরী করতে দেয়া হতনা। যোগদানের কিছুদিনের মাথায় চলেযেতে হয়েছে অনত্র।

ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার আমলে বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল ও কলেজ পরিচালনা কমিটির সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ। তার ইশারায় চলত গোটা মেডিকেল ও কলেজ। তার আনুগত্যের সিন্ডিকেট এখানে নতুন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়নে ঢাল হয়ে দাড়িয়ে থাকতেন। হার্ট স্পেশালিস্ট থেকে শুরু করে মেডিসিনের বড় বড় ডাক্তারদের অপমান অপদস্থ করে জোর করে চলেযেতে বাধ্য করা হত। এধরনের প্রোপাগান্ডা চলমান থাকায় ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলে পদ্মার এপারে কোন ডাক্তার ভয়েও পদায়ন নিতে চাইতো না। যাতে সেবা বঞ্চিত হয়েছে দক্ষিণাঞ্চেলর মানুষ। এছাড়াও বিশেষ করে ক্লিনিকাল সাবজেক্ট গুলোতে যাতে পদায়ন না হয় সেই জন্য কাজ করত এই সেন্ডিকেট।

গত ৫ই আগস্ট পরবর্তীতে যখন আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের দোসররা এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায় এই সিন্ডিকেট ও তাদের দোসররা হাসপাতালে আসা বন্ধ করে দেয়, এবং ক্যাম্পাসে তাদের পূর্ববর্তী কর্মকান্ড ও ছাত্রদের উপর অত্যাচারের কারনে দোষরদের ক্যাম্পাসে অবাঞ্চিত ঘোষনা করা হয়। তখন স্বাস্থ্য প্রশাসন তাদের অন্যত্র বদলী করে দেয়।

যার কারেন মেডিকেল কলেজের শিক্ষা ব্যাবস্থা একদম মুখ থুবড়ে পড়ে। বিষটি সাধারণ শিক্ষার্থীরা উপলব্ধি করতে পেরে আন্দোলনে নেমে পড়ে। নতুন শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে কলেজ কে “কম্পিলট শাট ডাউন” ঘোষনা করে দেয়া হয়েছে। এ এখনও চলমান রয়েছে।

এ বিষয়ে বরিশালের সাধারন নাগরীক সমাজের আহবায়ক, কাজী মিজানুর রহমান বলেন, চায়ের দোকানদার থেকে শুরু করে গন ভবন পর্যন্ত সবাই রাজনীতি করে। ডাক্তাররা তো এর মধ্যেই, তবে দল করা বা এর সমর্থন দেয়া পেশার উর্ধ্বে রেখে মানুষের সেবা দেয়ার ব্রতকে প্রাধান্য দেয়া দরকার বেশি ছিল। তা না করে স্বার্থ হাসিল করতে ব্যস্ত ছিলেন তারা। আমরা ধ্বস হয়ে গেছি, আগামী ৫০ বছরেরও এর থেকে বের হওয়া সম্ভব নয়। আমরা আসলে দেশ প্রেমিক না, দেশকে ভালোবাসিনা, নিজের অর্থকে ভালোবাসী, নিজের দলকে ভালোবাসী, আমরা যে এই দুষ্ট চক্রের মেধ্য পড়ছি এক আল্লাহ ছাড়া উদ্ধার করার কেউ নেই।

দক্ষিণাঞ্চলের প্রান মেডিকেল কলেজটি ইতিহাসে এই প্রথম শিক্ষক সংকট নিরাসনে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার সুবিধা পূরনে কলেজটি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচী পালন করছে ছাত্র-ছাত্রীরা। এ কারনে একাডেমিক কার্যক্রমের পাশাপাশী শিক্ষার্থীদের মনবল ক্রমাগত ভাবে ভেঙ্গ পড়ছে। সেশন জট কিংবা পিছিয়ে পড়ার ভয়ে দিন কাটছে অনেক শিক্ষার্থীর।

একাধিক শিক্ষার্থী জানিয়েছে, কলেজে লেকচারারা থাকলেও নেই কোন প্রফেসর, নেই অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক। এরকম ভাবে একটি সরকারী মেডিকেল কলেজ চলতে পারেনা। শিক্ষার্থীদের জোড়া তালী দিয়ে একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনা তাদের মেধার অবনতি ঘটাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রান পাওয়া জরুরী। তাই যতদিন সকল দাবি আদায় না হবে কলেজ বন্ধ থাকবে। ক্ষতি তো হচ্ছে সেই ক্ষতির মাঝে দাবি আদায় হলে আমরা পুষিয়ে নিতে পারব।

এবিষয়ে শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ডা. কামরুদ্দোজা হাফিজুল্লাহ বলেন, শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলে পড়ালেখার যে ক্ষতি হয়েছে তা সিডিউল ওভারকাম করার চেষ্টা করতে হবে। আশা করি শিক্ষার্থীরা বাড়তি মনোযোগের মাধ্যমে সেটা পুরন করতে পারবে।

ফ্যাসিস্টদের রাজনৈতিক পেক্ষাপটের কারনে আজকের এই সংকট সৃষ্টির প্রশ্নে ডা. কামরুদ্দোজা হাফিজুল্লাহ বলেন, ব্যাক্তি স্বার্থ হাসিল কিংবা দলীয় প্রভাবের কারনে সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

সেন্ডিকেট প্রশ্নে তিনি বলেন, সে টা তো ছিলই, যার কারনে অনেক ডাক্তার এখানে আসতে চায়না। তাছাড়া ব্যাক্তিগত পছন্দের কারনে আসতে চায়না। থাকতে চায় না।

কলেজ প্রশাসন সূত্র জানায়, দেশের প্রাচীন ও বৃহত্তম বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজে ৬০ শতাংশের ওপর শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপকের ৩৩৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৪৬ জন। বাকি ১৮৮টি পদ শূন্য রয়েছে। ৫০টি অধ্যাপকের পদের বিপরীতে মাত্র ছয়জন অধ্যাপক রয়েছেন। এর ফলে তাদের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া দুরূহ হয়ে পড়েছে।

শেবাচিমের শিক্ষক সংকটে প্রায়শই ফরেনসিক বা কমিউনিটি মেডিসিন এর মত ডিপার্টমেন্ট শিক্ষক শুন্য থাকে। মাঝে মাঝে একজন শিক্ষক দিয়ে চলে চালিয়ে নেওয়া হয় কার্য়ক্রম।

গত একসপ্তাহের আন্দোলনে বেশ কিছু নতুন শিক্ষক এর পদায়ন হয়। এর মেধ্যে সাইকিয়াট্রি অধ্যাপক ডাঃ মোঃ তারিকুল আলম, লেকচারার, মাইক্রোবায়োলজি (পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন) ডাঃ প্রজ্ঞা সাহা, লেকচারার,কমিউনিটি মেডিসিন (পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন) ডাঃ সাগর রায়, লেকচারার,কমিউনিটি মেডিসিন (পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন) ডাঃ এস ডব্লিউ ফয়সাল আহমেদ , লেকচারার, প্যাথলজি (পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন) ডাঃ সত্যব্রত ঘোষ, লেকচারার,এনাটমি ডাঃ গোলাম সরোয়ার।

এছাড়া ডা. আকবর কবীর ও সহযোগী অধ্যাপক ডা. প্রবীর ও কিউরেটর (এনাটমি) ডাঃ মো সাইফুল ইসলাম এর বদলি অর্ডার বাতিল করা হয়েছে।

অপরদিকে শেবাচিমে বর্তমানে কর্মরত প্যাথলজিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা ডা মার্জিয়া জাহান চৌধুরী, ডা মারুফা আক্তার, ডা মো জহিরুল ইসলাম, মাইক্রোবায়োলজিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা ডা. উম্মা ইসরাত জাহান সানি, বায়োকেমিস্ট্রিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা ডা. সোহানা আক্তার ও ডা. খাজা বদরুদ্দোজা, ফার্মাকোলজিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা ডা. ফাতিমা ফেরদৌস ও ডা. শুভ্রা দেবী হালদার, ফিজিওলজিতে পোস্ট গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করা ডা. হৈমন্তী দে, ডা. শুভ্রা মন্ডল, ডা. রাশেদুল হাসান কে চলতি দায়িত্বে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেবার জন্য কলেজ প্রশাসনের মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে যা শিক্ষক সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখবে।

শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ শিক্ষক সমিতির সভাপতি ডা. কামরুদ্দোজা হাফিজুল্লাহ আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের কাছে একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক সমিতি।

নোটিশে বলা হয়েছে, মেডিকেল কলেজে বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষক সল্পতা অত্যন্ত প্রকট। এর প্রেক্ষিতে বিগত কয়েকদিন যাবৎ ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলন করে আসছে। গতকাল ২৩/২/২০২৫ তারিখ পর্যন্ত শিক্ষক পদায়নের যে প্রজ্ঞাপন গুলো জারি হয়েছে তার মাধ্যমে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের শিক্ষক সংকট সমাধানের একটি পথ খুলে গিয়েছে বলে আমরা মনে করি। অধ্যক্ষ মহোদয়, শিক্ষক সমিতি, সকল শিক্ষকবৃন্দ এবং ছাত্র-ছাত্রীসহ সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এটি সম্ভব হয়েছে। আমরা আশা করব এর ফলে কলেজের একাডেমিক কার্যক্রম সহ অন্যান্য সকল কাজে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের দৈনন্দিন কর্মব্যস্ততা ও ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাশের ব্যস্ততায় আবার ফিরে আসবে শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের কর্ম চাঞ্চল্য।

তবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে স্মারকলিপি দিয়ে কলেজ প্রশাসন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে দাবির কথা জানিয়ে শীক্ষার্থীদের চলমান কম্পিলিট শাট ডাউন কর্মসূচি চলমান রয়েছে।###

Leave A Reply

Your email address will not be published.