হেলথ ইনফো ডেস্ক :
একটি পূর্ণ জীবনচক্রভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা বলয় গঠনের দিকে এগোচ্ছে সরকার। গর্ভকাল থেকে শুরু করে শেষ জীবন পর্যন্ত নাগরিকের সুরক্ষা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
বৃহস্পতিবার (৭ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। সেমিনারে ‘বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবার অপূর্ণতা এবং ব্যক্তিগত ব্যয়ে চিকিৎসার গতিপ্রকৃতি পুনর্বিবেচনা’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, এটি দাতব্য নয়, এটি নাগরিকের অধিকার। রাষ্ট্রের দায়িত্ব এই অধিকার নিশ্চিত করা। স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটালাইজেশন এবং সঠিক নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। ই-হেলথ কার্ড স্বাস্থ্য খাতে অপচয় কমানো এবং সেবা গ্রহণ সহজ করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
তিতুমীর বলেন, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানো গেলে বৈষম্য কমানো সম্ভব। তবে সেই ব্যয় কোথায় কীভাবে করা হবে, সেটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তার মতে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় জোর না দিলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া সম্ভব না। আমরা মনে করি, প্রথমেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা দিতে হবে। একই সঙ্গে সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি সেবাও গুরুত্বপূর্ণ, তবে প্রাথমিক পর্যায়কে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, সরকার মনে করছে স্বাস্থ্যকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এজন্য গর্ভাবস্থা থেকে শুরু করে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব দাতব্য নয়, বরং অধিকারভিত্তিক একটি কাঠামোর অংশ।
স্বাস্থ্যসেবাকে জীবনচক্রভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। শিশুর জন্ম থেকে শুরু করে শিক্ষা, নারী ও শিশু স্বাস্থ্য এবং বয়স্কদের সুরক্ষা—সবকিছুই একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষভাবে নারীর ক্ষমতায়নকে উন্নয়নের কেন্দ্রীয় সূচক হিসেবে ধরা হচ্ছে। কারণ নারীর স্বাস্থ্য ও অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সরকার ইতোমধ্যে সর্বজনীন ফ্যামিলি কার্ড চালু করেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী, বিধবা এবং বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেক ক্ষেত্রে যাদের তালিকাভুক্ত হওয়া দরকার তারা হচ্ছেন না, আবার অনেকে তালিকাভুক্ত হয়ে যাচ্ছেন। এ সমস্যা সমাধানে একটি কার্যকর ডাটাবেজ ও ডিজিটাল ব্যবস্থা দরকার।
জনভোগান্তি দূর করতে ই-হেলথ কার্ড চালুর পরিকল্পনা নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে একজন নাগরিকের স্বাস্থ্য ইতিহাস, চিকিৎসা তথ্য এবং সেবা গ্রহণের রেকর্ড এক জায়গায় সংরক্ষিত থাকবে। এতে চিকিৎসা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আসবে এবং অপ্রয়োজনীয় খরচ কমবে। স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সেটি সঠিকভাবে ব্যবহার করাও জরুরি। আমরা চাই, জিডিপির পাঁচ শতাংশ পর্যন্ত স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হোক এবং সেটি যেন কার্যকরভাবে ব্যবহার হয়।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ব্যয় বাড়ানো মানে অপচয় বাড়ানো নয়। বরং দক্ষতা বাড়িয়ে সীমিত সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। সরকার ইতোমধ্যে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবা কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। এসব কর্মী মূলত রোগ প্রতিরোধ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় কাজ করবেন। এতে হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ ঘরোয়া পর্যায়েই প্রাথমিক সেবা পাবে।
তিনি বলেন, দেশে অসংক্রামক রোগ যেমন ডায়াবেটিস, হৃদরোগ এবং কিডনি রোগ দ্রুত বাড়ছে। এর প্রধান কারণ পরিবেশ দূষণ, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এবং নগরায়ণ। এসব রোগের চিকিৎসা ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর আর্থিক চাপ বাড়ছে।
তিতুমীর বলেন, সরকার ২৫০ শয্যার হাসপাতালগুলোতে তিনটি বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে রয়েছে কার্ডিয়াক কেয়ার ইউনিট, কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা এবং জটিল গাইনী ও প্রসূতি সেবা। এই তিনটি সেবা আমাদের জন্য খুবই জরুরি। কারণ এসব ক্ষেত্রে রোগীর চাপ বেশি এবং ব্যয়ও বেশি। স্বাস্থ্য খাতে প্রোগ্রামিং, বাস্তবায়ন এবং মনিটরিং ব্যবস্থার দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করেন। শুধু পরিকল্পনা করলেই হবে না, বরং তার বাস্তবায়ন কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে।
এর আগে স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে নাগরিকের কী পরিমাণ অর্থ গুনতে হয় এবং অর্থ সংকটে সেবাগ্রহণ ব্যাহত হওয়া সম্পর্কিত একটি গবেষণা প্রবন্ধ সেখানে উপস্থাপন করা হয়। গবেষণা প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক। সেমিনারের সভাপতিত্ব করেন সাবেক পরিকল্পনা উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।
