ডা সোনিয়া আলম মৌ:
কোভিড ১৯-এর আতঙ্ক এখনো আমাদের পিছু ছাড়েনি কিন্তু এরি মাঝে দুই বছরের বিরতির পরে আবারও এক নতুন আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে পৃথিবীর বুকে। অতীতের দুঃস্বপ্ন সেই লকডাউনের আশঙ্কায় চিন্তিত সারা বিশ্বের মানুষ। কারণ কোভিড-১৯ মহামারির পরে, চীন আবারও একটি নতুন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সম্মুখীন হয়েছে। এইবারের ভাইরাসটি হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি) যা শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণ সৃষ্টি করে। এই প্রাদুর্ভাব চীনের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং হাসপাতালগুলোয় রোগীর সংখ্যাও বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রন শাখা এ ব্যাপারে সতর্কতামূলক একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে এবং পরিস্থিতির উপর নজর রেখেছে।
প্রতিবেশী দেশ ভারতেও ৬ জানুয়ারি ২০২৫ আট মাসের এবং তিন মাসের দুই শিশুর শরীরে এই ভাইরাসের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তাই এইচএমপিভি ভাইরাস নিয়েও কোভিডের মতো ক্রমশ বাড়ছে উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। তবে কোভিড-১৯ অন্য ধরনের ভাইরাস ছিল।
হিউম্যান মেটানিউমোভাইরাস (এইচএমপিভি) প্যারামিক্সোভিরিডি ফ্যামিলির অন্তর্গত একটি ভাইরাস। সাধারণত উপরের শ্বাসযন্ত্রে সংক্রমণ করে সাধারণ সর্দি-কাশির মতো লক্ষণ সৃষ্টি করে। তবে, শিশু, বৃদ্ধ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন (ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, লিভার ও কিডনি রোগ, হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, এইডস ইত্যাদি) ব্যক্তিদের মধ্যে এটি শ্বাসযন্ত্রের নিচের দিকে সংক্রমিত হয়ে ব্রঙ্কাইটিস, হাঁপানি বা নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।এই ভাইরাসটি প্রথম নেদারল্যান্ডে ২০০১ সালে শনাক্ত হয়। সাধারণত শীতকালে বায়ুদূষণ বা বাতাসের ধরন পরিবর্তন হওয়ার কারণেই এদের প্রকোপ বাড়ে।কখনো কখনো শরৎকালেও প্রকট হতে পারে। রোগ প্রতিরোধ কম সম্পন্ন মানুষের এইচএমপিভি নিউমোনিয়া থেকে অশোধিত মৃত্যুর হার ১০ শতাংশ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।চীনে ২০২৪ এর শেষের দিকে শুরু হলেও ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এইচএমপিভির প্রাদুর্ভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও এবং ছবিতে চীনের হাসপাতালগুলোর ভিড় দেখা গেছে, যেখানে রোগীরা চিকিৎসার জন্য অপেক্ষা করছেন।
বিশেষ করে শিশুদের হাসপাতালে এই ভিড় বেশি দেখা যাচ্ছে। চীনে ১৪ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে এইচএমপিভির হার বাড়ছে। বিশেষত স্কুলে বা হোস্টেলের মতো জায়গায় বাচ্চারা একসঙ্গে থাকার জন্য এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যদিও চীন জানিয়েছে, এটা সিজনাল ফ্লুর প্রকোপ। খুব বেশি আতঙ্কিত হওয়ার বা মহামারি ঘোষণার মতো এখনই কিছু ঘটেনি।
তবে সংক্রমণটি একদম নতুন না হলেও, এই ভাইরাসের বিষয়ে প্রাথমিক সচেতনতায় প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কারণ এখন ভাইরাসটির নতুন কোনো মিউটেশন হয়েছে কিনা বা এটি আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে কিনা তা এখনো জানা যায়নি। এসব নিয়ে গবেষণা চলছে।
তবে এই ভাইরাস নতুন না। প্রায় ৫০ বছর ধরে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব মানব সভ্যতায় রয়েছে। আমাদের দেশে আগেও এই ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। দেশে এই ভাইরাস নতুন না।
কোভিডের মতোই সাধারণত হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস ছড়ায়। এছাড়া সংক্রমিত ব্যক্তি বা তার ব্যবহার করা জিনিসের সংস্পর্শে এলে, কোথাও স্পর্শ করে হাত না ধুয়ে নাকে-মুখে-চোখে হাত দিলে এই ভাইরাস ছড়াতে পারে। সাধারণত সংক্রমণের ৩-৭ দিনের মধ্যে রোগের লক্ষণ দেখা যায়।
সাধারণ ফ্লু’র মতো জ্বর, কাশি, নাক বন্ধ বা সর্দি, মাথাব্যথা, গলা ব্যথা, শরীর ব্যথা বা ক্লান্তি লাগা এইচএমপিভি ভাইরাসের সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ। তবে শিশু, কম রোগ-প্রতিরোধ সম্পন্ন ব্যক্তি এবং বৃদ্ধদের মধ্যে এটি শ্বাসকষ্ট বা নিউমোনিয়ার মতো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।
লেখক : ডা সোনিয়া আলম মৌ, রেসিডেন্ট, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল,ঢাকা।