হেলথ ইনফো ডেস্ক :
দেশের বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাসগুলোর শতবর্ষী ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে দফায় দফায় পলেস্তারার ধস এবং সিলিংয়ের রড খসে বৈদ্যুতিক পাখা খুলে পড়ে আহত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই দিন কাটছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের। হলের ভেতর চলাচল থেকে ঘুমানো পর্যন্ত সব কিছুতেই রয়েছে দুর্ঘটনার ভয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ১৩৫ বছরের পুরোনো ঝুঁকিপূর্ণ ভবনেই চলছে পড়াশোনা ও আবাসনের কার্যক্রম।
সম্প্রতি ভূমিকম্পে রাজধানীসহ সারাদেশ ভয়াবহভাবে কেঁপে ওঠা এবং সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষার্থীর নিহত হওয়ার ঘটনায় শিক্ষার্থীদের জীবন দারুণভাবে প্রভাবিত হয়েছে। তারা না পারছেন স্বস্তি নিয়ে হলে অবস্থান করতে, না পারছেন পড়াশোনা করতে।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ
জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস ও ছাত্রাবাসে অবস্থান করছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীরা। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় শত বছরের পুরনো ভবনের ছাদ ও দেয়াল থেকে ধসে পড়ছে পলেস্তারা, কোথাও বা চুঁইয়ে পড়ছে পানি।
শিক্ষার্থীদের তরফ থেকে বারবার ক্লাস ও আবাসনের বিকল্প ব্যবস্থার পাশাপাশি ভবন নির্মাণের দাবি জানানো হয়। তবে তাতে মিলেছে কেবলই আশ্বাস। তাদের খেদোক্তি, মানব সেবার যে স্বপ্ন ও উদ্দীপনা নিয়ে এসেছিলেন স্বপ্নের মেডিকেলে, ভবনগুলোর বেহাল দশার কারণে তা ক্রমেই ফিকে হয়ে আসছে।
মেরামতের অনুপযোগী হওয়ায় সম্প্রতি আবাসিক হলের মূল ভবনের চারতলা পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে পিডব্লিউডি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৮ মে আবাসিক হল খালি করার নির্দেশ দেয় মেডিকেল কর্তৃপক্ষ। তবে বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় হল ছাড়তে পারছেন না শিক্ষার্থীরা।
নবীন বরণের অনুষ্ঠান বর্জন
আবাসন সংকট ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের কারণে নবীন বরণের অনুষ্ঠান বর্জন করেন ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের ঢামেক শিক্ষার্থীরা। ফলে সারাদেশের মেডিকেলগুলো উৎসব মুখর থাকলেও ওই দিন বিবর্ণ ছিল দেশসেরা মেডিকেলের ক্যাম্পাস।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ
পুরান ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের (এসএসএমসি) ছাত্রাবাসের বেহাল দশা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক জীবন ও পড়াশোনা বাধাগ্রস্ত করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীরা জানান, ‘প্রধান ছাত্রাবাসটি বহুদিনের পুরোনো একটি ভবন। কিছুদিন আগে এক শিক্ষার্থীর মাথার ওপর একটি ফ্যান খুলে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রধান ছাত্রাবাসের বর্ধিত অংশটিও প্রায় ৪০ বছর পুরনো। জায়গায় জায়গায় ফাটল, দেয়াল থেকে বিশাল বড় পলেস্তারা খসে পড়ছে নিয়মিত।’
পায়ের ভারেই কাঁপে অ্যানাটমি ভবন
ডিসেম্বরে ভবনটি ভেঙে শিক্ষার্থীদের অ্যানাটমি ভবনে সরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে। তবে সেটির অবস্থাও নাজুক। ১৩৫ বছরের পুরোনো ওই ভবন পায়ের ভারেই কেঁপে ওঠে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, যতদিন না স্থায়ী ছাত্রাবাস নির্মাণ হচ্ছে, ততদিন মেডিকেল কলেজের বাইরে ভাড়া নিয়ে নিরাপদ অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানানো হয়েছে। তবে তা মানছে না কর্তৃপক্ষ।
শিক্ষার্থীরা আরও জানান, ‘অ্যানাটমি ভবনে আবাসনের ব্যবস্থা করার পর সেখানে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় কে নেবে—এই প্রশ্নেরও স্পষ্ট জবাব দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। নারী শিক্ষার্থীদের হলের অবস্থাও ঝুঁকিপূর্ণ। গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজি বিভাগকে দশ বছর আগেই পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। আলাউদ্দিন হলের ওয়াশরুম থেকেও নিয়মিত পলেস্তারা খসে পড়ছে। এমন পরিবেশে আমাদের বাবা-মায়েরা প্রতিদিনই শঙ্কায় থাকেন—সন্তান পরের দিন বেঁচে ফিরবে কি না! আমাদের চোখের সামনেই পলেস্তারা ধসে পড়ে। ভূমিকম্পে যেভাবে আমাদের এক বন্ধুকে হারিয়েছি, ঠিক সেভাবেই কোনো একদিন আমরা নিজেরাও ঝরে পড়ব—এই ভয় নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।’
ছাত্রাবাসের পলেস্তারা ধসে পড়া ও সিলিং থেকে বৈদ্যুতিক পাখা খুলে পড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে, এসএসএমসির অধ্যক্ষ ডা. মাজহারুল ইসলাম শাহীন মেডিভয়েসকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে বৈদ্যুতিক পাখা ধসে পড়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি।’
এ বিষয়ে ছাত্রাবাস প্রধানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করেন তিনি।
রংপুর মেডিকেল কলেজ
১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত রংপুর মেডিকেল কলেজে (রমেক) ছাত্রদের জন্য তিনটি এবং ছাত্রীদের জন্য দুইটি আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘদিন অবহেলা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ডাক্তার মুক্তা এবং ডাক্তার পিন্নু ছাত্রাবাস প্রায় বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
শিক্ষার্থীরা জানান, ছাত্রাবাসের একাধিক কক্ষে ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। কিছু কক্ষে জানালা নেই, আবার কিছুতে টয়লেটও ব্যবহারের অনুপযোগী। এ ধরনের কক্ষে আমরা বলা চলে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই অবস্থান করছি। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার বাধ্য হয়ে ছাত্রাবাস ছেড়ে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছেন।
শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, ‘সদ্য নির্মাণাধীন পার্শ্ববর্তী নতুন হোস্টেলের পাইলিংয়ের সময় প্রতিদিনই কয়েকবার পুরো ভবন কেঁপে ওঠে, আর তখনই সিলিং থেকে খসে পড়ে পলেস্তারা।’
ছাত্রাবাসে যাতায়াতের সড়কের পাশে ড্রেনগুলো কিছুদিন পরপরই ভরাট হয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয় জানিয়ে শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘সামান্য বৃষ্টি হলেই পার্শ্ববর্তী হাইওয়ের পানি নিচু সড়কে প্রবেশ করে চলাচলের অনুপযোগী করে তোলে। বেশি বৃষ্টি হলে নিচতলার কিছু কক্ষে পানি প্রবেশ করে। এতে বিগত বছরগুলোতে একাধিক দিন শিক্ষা কার্যক্রম অঘোষিতভাবে স্থগিত হয়ে যায়।’
এ বিষয়ে জানতে মুঠোফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও রমেকের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলামকে পাওয়া যায়নি।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) অবস্থাও একই রকম। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, পলেস্তারা ধসে পড়া এবং জরাজীর্ণ দেয়ালের মধ্যেই চলছে মেডিকেল শিক্ষার্থীদের আবাসন ও পাঠদান কার্যক্রম।
শিক্ষার্থীরা জানান, জামিলুর রহমান পাপ্পু হলে ছাদের পলেস্তারা নিয়মিত খসে পড়ে। দেয়াল অত্যন্ত জরাজীর্ণ, আর টয়লেটের অবস্থাও নোংরা।
হাবীবুর রহমান হল পুরোপুরি ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে তারা বলেন, ভবনটি ভাঙার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আংশিক কাজ শুরু হলেও শিক্ষার্থীদের এখনো পর্যন্ত সেখানেই থাকতে হচ্ছে। তাদের স্থানান্তরের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়নি।
এ ছাড়া মঈনুল হায়দার হলে পানিতে প্রায়ই পোকা পাওয়া যায়। যখন-তখন কুকুর ওপরতলায় উঠে আসে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, হল ক্যান্টিনগুলো ঠিকমতো তদারকি করা হয় না, ফলে অনেকেই সেখানে খাবার গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। নারী শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাসের চিত্রও একই রকম।
এ বিষয়ে জানতে শেবাচিম অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. ফয়জুল বাশারকে মুঠোফোনে একাধিক চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।