হেলথ ইনফো ডেস্ক :
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ডা. সজীব সরকারের মা ঝর্ণা বেগমের শারীরিক অবস্থা সংকটাপন্ন। তিনি তীব্র শ্বাসকষ্ট নিয়ে রাজধানীর উত্তরায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। অবস্থা স্থিতিশীল হলেও তাঁর অক্সিজেন নেওয়ার সক্ষমতা কমে গেছে। এ অবস্থায় দেশের বাইরে নিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ডা. সজীবের বাবা হালিম সরকার।
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) বিকেলে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন স্ত্রীর পাশে বসে মেডিভয়েসের সাথে একান্ত আলাপে এ আহ্বান জানান তিনি।
ডা. সজীবের মায়ের নিরবচ্ছিন্নভাবে অক্সিজেন লাগছে জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘এখান থেকে বেরিয়ে আসতে রাষ্ট্র যদি একটি পদক্ষেপ নেয়, তাহলে ভালো হতো। উনি অক্সিজেন ধরে রাখতে পারছেন না, কেন পারছেন না; এটা নির্ণয়ে চিকিৎসক মহলকে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করছি। এ ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিলে দেশের বাইরে ভালো একটি চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। আমাদের পরিবারের সদস্যদের ঘুম ও খাওয়া-দাওয়া নেই। সবাই একটি হতাশার মধ্যে আছি। রাষ্ট্রসহ সকল চিকিৎসকের কাছে অনুরোধ, জরুরি ভিত্তিতে দেশের বাইরে নিয়ে যেন সজীবের মায়ের চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া হয়।’
এ সময় সজীব সরকারের মায়ের চিকিৎসায় এক লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। স্বজনদের হাতে টাকা তুলে দিয়ে এনডিএফ ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহ বলেন, ‘শহীদ সজীব সরকারের পরিবারের সাথে আমাদের যে যোগাযোগ এবং আমাদের সীমিত সামর্থ নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানোর যে প্রচেষ্টা, এটা আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে করেছি এবং চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমরা মনে করি, আমরা পুরোপুরি তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবো না। পেশাজীবী একটি সংগঠন পুরো দায়িত্ব নিতে পারে না। রাষ্ট্রকে এ দায়িত্ব নিতে হবে।’
এ সময় উন্নত চিকিৎসার জন্য সজীবের মাকে দেশের বাইরে পাঠানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সজীবের মা তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত জটিল ও দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। রোগীর অক্সিজেন নেওয়ার যে সক্ষমতা সেটা কমে গেছে। খুবই কষ্টকর ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা—যে কোনো সময় যে কোনো কিছু হতে পারে। এর চিকিৎসাও জটিল। কাজেই এই চিকিৎসায় রাষ্ট্র এগিয়ে আসবে, প্রয়োজনে দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাবে। এ ব্যাপারে আমরা দৃঢ়ভাবে রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’
ছেলে শহীদ হওয়ার পর থেকে নানা সহায়তায় পাশে থাকায় এনডিএফের কাছে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন শহীদ সজীবের বাবা হালিম সরকার। তিনি বলেন, ‘সজীবের মা দীর্ঘ দিন ধরে অসুস্থ আছেন। এনডিএফের চিকিৎসকরা সক্রিয়ভাবে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন এবং ডা. সজীবের মায়ের শারীরিক অবস্থার খোঁজ-খবর প্রতিদিনই তাদের কেউ না কেউ রাখছেন। সম্প্রতি তার অবস্থা খারাপ হয়ে গেলে আমরা পরিবারের সবাই হতাশ হয়ে যাই। তখন এনডিএফের কিছু চিকিৎসক আমাদের অভয় দিয়েছেন যে, ইনশাল্লাহ ঠিক হয়ে যাবে এবং আমরা আপনাদের পাশে আছি। আসলেই তাঁরা পাশে আছেন। তাদের কয়েকজন চিকিৎসক তাৎক্ষণিভাবে এখানে এসেছেন।’
বুধবার (২৮ জানুয়ারি) এনডিএফের তরফে ডা. সজীব সরকারের মায়ের চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা প্রদানের সময় উপস্থিত ছিলেন সংগঠনের সহকারী সমাজসেবা সম্পাদক ডা. সারোয়ার তুহিন।
গত ২১ জানুয়ারি এভারকেয়ার হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিয়ে ফেরার পথে হঠাৎ ঝর্ণা বেগমের তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে তাঁকে উত্তরার হাসপাতালটিতে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি দুই দিন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। গত ২৩ জানুয়ারি তাঁর জ্ঞান ফিরে। বিকেলে তাঁকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখতে এইচডিইউতে স্থানান্তর করা হয়।
তিনি দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড হরমোনের স্বল্পতা, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (ক্রনিক কিডনি ডিজিজ), ঘুমের সময় শ্বাসপ্রশ্বাসে বাধাজনিত সমস্যা (অবস্ট্রাকটিভ স্লিপ অ্যাপনিয়া) এবং ডায়াবেটিসজনিত স্নায়ু ক্ষতি (ডায়াবেটিক পলিনিউরোপ্যাথি) রোগে আক্রান্ত। গণ-অভ্যুত্থানে ছেলে শহীদ হওয়ার পর থেকেই তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
এর আগে ২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় ১৮ জুলাই উত্তরার একটি মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত ছোটভাই আব্দুল্লাহকে আনতে গিয়ে আজমপুর এলাকায় পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন ডা. সজীব। জুলাই অভ্যুত্থানের সম্মুখযোদ্ধারা তাঁকে বাঁচাতে নিয়ে যান উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। কিন্তু ততক্ষণে নিভে যায় প্রাণপ্রদীপ। কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।