ডা. মো: জিয়াউল হাসান, এম, এস (অর্থো সার্জারি ),ফেলো স্পাইন সার্জারি,অর্থোপেডিক স্পাইন সার্জন,নিটোর, ঢাকা।
কোমর ব্যথা আমাদের মধ্যে এমন একটি সাধারণ সমস্যা, যা জীবনের কোনো না কোনো সময়ে প্রায় সবাইকেই ভোগায়। এটি কখনো অল্প কিছুদিনের জন্য হতে পারে, আবার কখনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যায় রূপান্তরিত হয়ে জীবনযাত্রাকে অনেক কঠিন করে তুলতে পারে। পিঠের নিচের (Lower Back) অংশে অনুভূত এই ব্যথা মূলত ভুল অঙ্গবিন্যাস, পেশি দুর্বলতা, বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের কারণে হতে পারে। তবে সঠিক অভ্যাস এবং জীবনযাত্রার মাধ্যমে এই সমস্যাকে প্রতিরোধ এবং নিরাময় করা সম্ভব।
এখন আসুন আমরা কোমর ব্যথার কারণ, উপসর্গ, এবং এর প্রতিকার ও প্রতিরোধ বিষয়ে আমাদের করণীয় সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নেই ।
কোমর ব্যথার কারণ: কেন হয় এই সমস্যা?
সাধারণত আমাদের কোমর ব্যথার পেছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। এগুলো মূলত আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অভ্যাস, শারীরিক অবস্থা, এবং কর্মক্ষেত্রের পরিবেশের সঙ্গে সম্পর্কিত।
১. ভুল অঙ্গবিন্যাস
➢ দীর্ঘ সময় বসে থাকার সময় পিঠ বাঁকা রাখা।
➢ শোয়ার সময় ভুল বা অস্বাস্থ্যকর অঙ্গবিন্যাস।
➢ কাজ করার সময় সামনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকা।
২. কোমরের মাংসপেশির দুর্বলতা
নিয়মিত ব্যায়ামের অভাব বা শারীরিক পরিশ্রম না করার কারণে কোমরের মাংসপেশি অধিকতর দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে কোমরের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং একপর্যায়ে ব্যথা শুরু হয়।
৩. অতিরিক্ত ওজন
যদি কারো শরীরের ওজন বেশি হয়, তাহলে তার কোমরের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। সেক্ষেত্রে, এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকলে কোমরের মাংসপেশি এবং হাড় দুর্বল হয়ে যায় এবং এর ফলে কোমর ব্যাথার সৃষ্টি হয়।
৪. ডিস্ক সমস্যাজনিত কারণ
আমাদের শরীরের মেরুদণ্ডের হাড়গুলোর মাঝে থাকা ডিস্ক যদি স্থানচ্যুত হয় বা ফেটে যায়, তাহলে স্নায়ুর ওপর চাপ পড়ে। এটি কোমর ব্যথার একটি অন্যতম বড় কারণ।
৫. ধূমপান
অনেক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ধূমপান কোমর ব্যথার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি।
কারণ স্মোকিং বা ধুমপান এর ফলে ব্যাক মাসেল উইক হয় বা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মেরুদণ্ডের ডিস্ক ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া স্মোকিং এর ফলে মানুষের কোমরে যে ডিস্ক থাকে সেই ডিস্ক প্রোল্যাপস সহ বিভিন্ন রকম রোগ হতে পারে।
৬. অতিরিক্ত ভারী জিনিস তোলা
যদি ভারী জিনিস তোলার সময় সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ না করা হয়, তাহলে এটি কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে যা পরবর্তীতে কোমর ব্যথায় রূপ নেয়।
৭. আঘাতজনিত কারণ
যেকোনো ধরনের শারীরিক আঘাত, যেমন—দুর্ঘটনা, পড়ে যাওয়া বা ক্রীড়াজনিত বিভিন্ন আঘাত কোমর ব্যথার কারণ হতে পারে।
৮. মানসিক চাপজনিত কারণ
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ পেশির টানটান ভাব বাড়ায়, যা কোমর ব্যথার অন্যতম কারণ হতে পারে।
৯. গর্ভাবস্থার কারণে
গর্ভাবস্থায় শরীরের ওজন বৃদ্ধি এবং হরমোনজনিত পরিবর্তনের কারণেও কোমর ব্যথা হতে পারে।
কোমর ব্যথার উপসর্গ
কোমর ব্যথার উপসর্গ ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে, তবে কোমর ব্যথায় সাধারণত নিম্নলিখিত লক্ষণগুলো দেখা যায়:
➢ কোমরের নিচের অংশে তীব্র বা মৃদু ব্যথা।
➢ দীর্ঘ সময় বসে থাকার পর দাঁড়াতে বা চলাফেরা করতে অসুবিধা।
➢ কোমর থেকে নিতম্ব ও পায়ের দিকে ব্যথা ছড়িয়ে পড়া।
➢ কোমরে শক্তভাব বা নড়াচড়ায় সীমাবদ্ধতা।
➢ কিছু ক্ষেত্রে পায়ে ঝিনঝিনে ভাব বা অবশ অনুভূতি।
কোমর ব্যথার প্রতিকার: কী করবেন?
এখন আসুন আমরা কোমর ব্যথার প্রতিকারের বিষয়ে জেনে নেই। কোমর ব্যথা নিরাময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো সঠিক জীবনযাপন পদ্ধতি অনুসরণ করা এবং কিছু সহজ অভ্যাস আমাদের মধ্যে গড়ে তোলা।
১. সঠিক অঙ্গবিন্যাস বজায় রাখা
সঠিকভাবে আমাদের অঙ্গবিন্যাস বজায় রাখা হলো কোমর ব্যথা প্রতিরোধ এবং নিরাময়ের প্রধান হাতিয়ার। যেমন:
সঠিকভাবে বসা:
➢ চেয়ারে বসার সময় পিঠ সোজা রাখুন।
➢ পায়ের তলা মাটিতে সমানভাবে রাখুন এবং কোমরের সঙ্গে চেয়ারের ব্যাকরেস্টের সম্পূর্ণ সংযোগ নিশ্চিত করুন।
➢ ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করার সময় স্ক্রিন চোখের সমতলে রাখুন।
সঠিকভাবে শোয়া:
➢ চিত হয়ে শোয়ার সময় হাঁটুর নিচে একটি বালিশ রাখুন, যা কোমরের স্বাভাবিক বায়োমেকানিক্স ঠিক রাখবে।
➢ শক্ত এবং সমান ম্যাট্রেস ব্যবহার করুন।
সঠিকভাবে হাঁটা:
➢ মাথা উঁচু এবং মেরুদণ্ড সোজা রেখে হাঁটুন।
➢ প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটা অভ্যাস করুন। এটি কোমরের মাংসপেশি শক্তিশালী রাখে এবং শরীরে রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখে।
২. কোমরের মাংসপেশি শক্তিশালী রাখা
কোমরের পেশি শক্তিশালী রাখার মাধ্যমে কোমর ব্যথার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। এজন্য-
➢ প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটার কোনো বিকল্প নেই।
➢ হাঁটার পাশাপাশি নিয়মিত হালকা ব্যায়াম করুন। এটি কোমরের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
৩. কোমরের ব্যায়াম: সতর্কতা জরুরি
কোমরের ব্যায়াম নিয়ে অনেকের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে। মনে রাখতে হবে, সকলের জন্য একই ব্যায়াম প্রযোজ্য নয়। এজন্য কোমরের ব্যায়ামে কিছু সতর্কতা বজায় রাখা জরুরী, যথা:
➢ কোমরের ব্যায়াম করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
➢ ব্যায়ামের ধরণ রোগীর কোমরের সমস্যার প্রকারভেদে ভিন্ন হতে পারে।
➢ সাধারণত, যারা প্রতিদিন ২০-৩০ মিনিট হাঁটেন, তাদের জন্য বিশেষ কোন ব্যায়ামের প্রয়োজন হয় না।
৪. মেরুদন্ডের বায়োমেকানিক্স ঠিক রাখা
আমাদের মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক বায়োমেকানিক্স ঠিক রাখা কোমর ব্যথা প্রতিরোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য মেরুদন্ডের বায়োমেকানিক্স ঠিক রাখার জন্য নিম্নোক্ত বিষয় মেনে চলুন:
➢ ভার উত্তোলনের সময় হাঁটু বাঁকিয়ে বসুন এবং কোমর সোজা রাখুন।
➢ সামনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে কাজ করা বিরত থাকুন।
➢ সামনের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে বসা থেকে বিরত থাকুন।
৫. পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ
পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ আমাদের শরীরের মাংসপেশী এবং হাড় শক্তিশালী করতে অনেকাংশে সহায়তা করে থাকে। এজন্য-
➢ প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, এবং ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খাওয়া উচিত।
➢ দুধ, ডিম, মাছ, শাকসবজি এবং ফল খাওয়ার অভ্যাস করুন।
৬. মানসিক চাপ কমানো
মানসিক চাপ কমানোর জন্য নিয়মিত মেডিটেশন, যোগব্যায়াম, বা রিল্যাক্সেশন টেকনিক ব্যবহার করতে পারেন।
৭. চিকিৎসকের পরামর্শ
যদি ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা উপসর্গ গুরুতর হয়, তাহলে অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ইমেজিং পরীক্ষা, যেমন—এক্স-রে, এমআরআই প্রয়োজন হতে পারে।
৮. অস্ত্রোপচার
এছাড়া, খুব কম ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়, যেমন—ডিস্ক হার্নিয়েশন বা স্পাইনাল স্টেনোসিসের ক্ষেত্রে।
কী কী করবেন না
কোমর ব্যথা থেকে মুক্তি পেতে নিন্মোক্ত কিছু অভ্যাস থেকে বিরত থাকা খুবই জরুরি:
১. দীর্ঘ সময় বসে থাকা।
২. সামনের দিকে ঝুঁকে বসা বা কাজ করা।
৩. অতিরিক্ত ভারী জিনিস তোলা।
৪. ধূমপান।
৫. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যেকোনো ব্যায়াম শুরু করা।
পরিশেষে
কোমর ব্যথা প্রতিরোধ এবং নিরাময়ে সঠিক জীবনযাপন, নিয়মিত শারীরিক কার্যকলাপ এবং সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা অপরিহার্য। প্রতিদিন অন্তত ২০-৩০ মিনিট হাঁটা এবং সঠিক অঙ্গবিন্যাস বজায় রাখা কোমর ব্যথা থেকে মুক্তি পাওয়ার মূল চাবিকাঠি। তবে, যদি ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হয় বা ব্যথা তীব্র আকার ধারণ করে, তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মনে রাখবেন, ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনের মাধ্যমে বড় সমস্যার সমাধান সহজেই করা সম্ভব। তাই, কোমর ব্যথার সমস্যাকে অবহেলা না করে এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিন এবং সুস্থভাবে জীবনযাপন করুন।
রেফারেন্স:
1. Mayo Clinic: Low Back Pain Management
2. World Health Organization (WHO)
3. Prothom Alo Health Section
4. Global Burden of Disease Study, 2020
5. বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় রিপোর্ট, ২০২২
6. The Daily Star Health Report
লেখক : এম, এস (অর্থো সার্জারি )
ফেলো স্পাইন সার্জারি ইন্ডিয়া ও দক্ষিন কোরিয়া
অর্থোপেডিক স্পাইন সার্জন
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান, নিটোর, ঢাকা।